রবিবার, জুন ০৬, ২০১০

পেনাং পেনাং ...

এর আগে জানিয়েছিলাম পাঁচ ঘন্টা ড্রাইভের পর অবশেষে পেনাং পৌঁছেছি। অরূপের গাড়িতে আমি, রিতা, মাতিস, অভিক আর অরূপ নিজে। পেনাং এ ঢুকে প্রথমেই যা করেছি তা হলো পরদিন স্নোরক্লিং এর টিকিট কনফার্ম করা। সেটা হয়ে গেলে রাজ্যের আলস্য আমাদের জড়িয়ে ধরে। আমি দেশে একটানা ১০ ঘন্টার উপর ড্রাইভ করলেও ক্লান্ত হইনি কখনও, কিন্তু এখানে পেছনে বসে থাকার অনভ্যস্ততায় অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিলো। গতবার তিওমেন যাবার সময় অনেকখানি রাস্তা আমার হাতে স্টিয়ারিং তুলে দিলেও এবারে অরূপ মহানন্দে গাড়ি চালাচ্ছিলো, আমিও কিছু বলি নি।

যাই হোক আসুন আবারো মূল গল্পে ফিরে যাই।


বালি হাই

Streets of Georgetown সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আকাশও মেঘলা, কয়েকটা গাড়ি ইতোমধ্যেই হেড লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঠিক করলাম কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ডিনার সেরেই হোটেলে উঠব। গাড়ি চললো গার্নি ড্রাইভের দিকে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন বৃটিশ রাষ্ট্রদুত স্যার হেনরী গার্নিকে মালয় কম্যুউনিস্ট গেরিলারা এ রাস্তায় গুলি করে মেরেছিল। গুলির সময় সাথে থাকা স্ত্রী আর ড্রাইভারের জীবন বাঁচাতে উনি রোলস রয়েস থেকে নেমে যান এবং নিহত হন। মালয় কম্যুউনিস্ট পার্টির নেতা চিন পেং পরবর্তিতে জানিয়েছেন সেটা ছিলো একটা নিয়মিত টহলের ঘটনা এবং কয়েকদিন পর পত্রিকার খবরে তারা নিহতের পরিচয় জানতে পারেন।

20100417_9999_5 অরূপ এর আগেও এদিকে এসেছে, সুতরাং রাস্তা খুঁজে পেতে সমস্যা হলো না। এ ফাঁকে চুপিচুপি একটা কথা জানিয়ে রাখি, আমাদের সচল মাশীদের জন্ম কিন্তু এই পেনাং-এ। জর্জটাউনে সাগরের পাড় ঘেঁষে চমৎকার রাস্তা গার্নি ড্রাইভ, একপাশে নিচু রেলিং এর ওপারে সমুদ্র অন্যপাশে বেশিরভাগই খাবারের দোকান, স্টেশনারি শপ, প্রচুর টুরিস্ট হেঁটে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের পার ধরে, সময়টা ভাটার, রেলিং থেকে কিছুটা দূরে শান্ত সমুদ্র আস্তে আস্তে আরো দূরে নেমে যাচ্ছে, দুয়েকটা সামুদ্রিক পাখি ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে তাতে। এপারের নিয়ন সাইনগুলো আস্তে আস্তে আলো ছড়াতে শুরু করলে আমরা এসে পৌঁছালাম চমৎকার রেস্টুরেন্ট “বালি হাই”এ। ঢোকার দরজায় বড় বড় লেখা “If it swims we have it”।

প্রায় ৫০০ জনের বসার ব্যবস্থা রাখা বিশাল এই রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না তেমন কোনো সামুদ্রিক প্রাণী নেই। আর আশ্চর্য যে সবই জীবন্ত! একপাশে বিশাল বিশাল ট্যাঙ্কে ভেসে বেড়াচ্ছে ৫/৬ কেজি ওজনের অস্ট্রেলিয়ান লবস্টার থেকে শুরু করে নানান জাতের মাছ আর কাঁকড়া, কাঁকড়ারও আছে প্রকারভেদ, আলাস্কান স্পাইডার থেকে শুরু করে ৮ কেজি ওজনের রাজ কাঁকড়াও দেখলাম। আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেই কিছুক্ষণ পরই খাবার টেবিলে চলে আসবে, চাইলে পাশে কাচ দিয়ে ঘেরা রান্নাঘরের ভেতরে রান্নাটাও দেখে নেয়া যায়।

আমরা বসেছিলাম মূল শেডের বাইরে রাস্তার দিকে ছোট ঝুপরির নিচে, এদিকটা খোলা, তাকালেই সমুদ্র, একটু পর আমাদের দৃষ্টি আটকে দিয়ে গাড়ি পার্ক করা শুরু হলো, খাওয়ায় মন দিলাম আমরা।

চমৎকার স্বাদের এক টেবিল ভরা খাবার শেষ করে আমাদের আর উঠতে ইচ্ছা করছিলো না, এমন সময় শুরু হলো আকাশ কাঁপিয়ে ঝড়বৃষ্টি। আমরাও আড্ডা আর বিশ্রামের সময় পেলাম। ঘন্টা খানিক পর বৃষ্টি ধরে এলে উঠলাম, তখনও হোটেল ঠিক করা হয় নি আমাদের।


বাটু ফিরিঙ্গি

Penang street souvenir shop মালয়েশিয়ান ভাষায় বাটু মানে পাথর, সে অর্থে জায়গাটার নাম ফিরিঙ্গিদের পাথর। পেনাং এর উত্তর-পুবে বাটু ফিরিঙ্গি এর সুন্দর বিচ আর রাতে বসা হকার মার্কেটের জন্য বিখ্যাত। অনেকগুলো সুন্দর হোটেল পাহাড়ের কোল বেয়ে প্রায় বিচের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। জর্জটাউন থেকে বেশ আঁকাবাঁকা আর উঁচুনিচু রাস্তা ধরে এদিকে আসতে হয়। রাতে থাকার জন্য আমরা বেছে নিয়েছিলাম এখানকারই ডি'ফিরিঙ্গি হোটেল। পরদিন ভোরে আমাদের তুলে নেবার জায়গা এখানথেকে হাঁটা পথে পাঁচ মিনিট।

পরদিন ভোর ছয়টায় বাস ধরতে হবে, ডেকে তোলার দায়িত্ব আমি নিয়ে যার যার রুমে। চাবি ঘুরিয়ে ঢুকতেই অভ্যর্থনা জানালো বিশালাকায় ইঁদুর।


পুলাও পায়ার

IMG_7288 ভোরে সঠিক সময়ে উঠার বাড়তি সতর্কতা হিসাবে হোটেল ম্যানেজারকে বলে রাখলেও ভোরে ঠিক সময়মতো উঠতে পেরেছিলাম সবাই। ডাকতে এসে যদি ফিরে যাই সেজন্য দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়েছে অভিকরা। হাতমুখ ধুয়ে বাসের অপেক্ষায় হলিডে ইনের লবিতে পাঁচ মিনিট আগেই আসতে পেরেছি। বাসও এলো সময়মতো, আমরাও উঠে বসলাম, গাইড এসে সবার হাতে প্লাস্টিকের ব্যান্ড পরিয়ে দিয়ে গেল, পরবর্তী কয়েক ঘন্টা এটাই আমাদের টিকিট।

20100419_9999_166 ভোরে রাস্তায় তেমন ভিড় নেই, রাস্তায় মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ২/১ জন কে তুলে নিয়ে জেটিতে এসে দেখলাম আমাদের মতন জনা পঞ্চাশেক দাঁড়িয়ে আছে ফেরির অপেক্ষায়। পেনাং থেকে পায়ার ফেরিতে দুঘন্টা উত্তরে, লাংকাউই থেকে দক্ষিণে এক ঘন্টা। প্রতিদিন এ দু দ্বীপ থেকে ১০০ জনের অনুমতি মেলে পায়ারে যেতে। স্নোরক্লিং কিংবা স্কুবা এগুলোই থাকে উদ্দেশ্য। মালয়েশিয়ার অন্য সব স্নোরক্লিং সাইটের চাইতে এখানকার খরচ অনেক বেশি।

দু ঘন্টা পর তীর থেকে আধ কিমি দূরে পায়ার এর ভাসমান জেটিতে নেমে চারদিক একবার দেখে নিলাম। পানির নিচে কোরালের উপর ভাসমান ৪৯ বাই ১৫ মিটারের জেটি, তার উপর বসার জন্য গোল করে সাজানো টেবিল চেয়ার, কয়েকটি টয়লেট আর বাথরুম, একপাশে খাবার জায়গা আর স্যুভেনির শপ। চারদিকে নীল পানি, এর মাঝে কিছু জায়গা ঘেরাও দেয়া টুরিস্টদের জন্য, তার বাইরে সাঁতার কাটা নিষেধ। নিচে পানিতে তাকালে হরেক রকমের মাছ আর কোরাল চোখে পড়ে।

IMG_7286 টেবিলের উপর মাস্ক, একপাশে ফ্লিপার আর লাইফ জ্যাকেট। এক এক করে পড়তে পড়তে গাইডের বক্তব্যও শুনে নিলাম। সিঁড়ি বেয়ে পানিতে নামার সময় নিচে তাকালে কয়েক মিটার নিচের মাটি পরিষ্কার দেখা যায়, কোরালের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ভেসে বেড়াচ্ছে নানান প্রজাতির মাছ, খুব কাছে এসে গা ছুঁয়ে যায়, আবার ধরতে গেলে পালিয়ে যায়। পানির নিচে আলোছায়ার অদ্ভুত খেলা। উপরে কড়া রোদ। মাস্ক ঠিক থাকলে একটানা নিচে তাকিয়ে ভেসে থাকা সম্ভব। এখানকার সরবরাহ করা মাস্কগুলো অতি ব্যবহারে নতুনত্ব হারিয়েছে। মাঝে মাঝেই নোনা পানি ঢুকে যায়, নিঃশ্বাসের গরমের সাথে নোনা পানিতে চোখ জ্বলে।

IMG_7316 মাতিসের সাইজের মাস্ক মেলে নি, যেটা পড়েছে তাতে একটু পরপরই পানি ঢোকে, ফ্লিপারটাও সাইজে একটু বড়, তাতেও তার উৎসাহের কমতি নেই, সাঁতার কেটেই আনন্দ করছে। রিতার অবস্থাও তথৈবচ। সে আবার সাঁতার জানে না। মাতিস মাঝে মাঝেই ওর মাকে উৎসাহ দিচ্ছে, ‘মা মা এভাবে করো’।

IMG_7308 আমি নেমেছিলাম ক্যামেরা হাতে, একটু পর সেটা তুলে দিলাম অভিকের কাছে। এখানকার কোরাল সুন্দর, মাছ আর সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যাও বেশি। জেটির নিচে কাচ দিয়ে ঘেরাও দেয়া কেবিন আছে, তাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও নিচের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।

দুপুরের খাবার ব্যবস্থা জেটিতেই, বুফে। অনেকক্ষণ সাঁতার কেটে ক্ষুধা ভালোই পেয়েছে। পেটে ক্ষুধা নিয়ে খাবারের মান বিচার করি নি। খাওয়ার পর সবাই শার্ক দেখতে গেলেও আমি আবার পানিতে নেমেছিলাম।

Mahamariamman Temple বিকেলে ফিরতি যাত্রা, লানকাউই থেকে ফেরি এলে এক এক করে উঠে পড়লাম, মাঝখানে একটু ঝিমুনি এলেও উঠে বাইরের ডেকে চলে এসেছি। চারদিকে পানির উপর জেগে থাকা দু একটা পাহাড়ের মাথা আর দূরে পেনাং এর হাইরাইজগুলো আবছা আবছা দেখা যায়, ফেরির গতি ভালোই, ডেকের রোদ গায়ে অসহনীয় উঠার আগেই ফেরি জেটিতে চলে এলো। সেখান থেকে শেষ বিকালে হোটেল পৌঁছালাম। কথা ছিলো সেদিনই কুয়ালালামপুর ফিরবো। কিন্তু দেখা গেল সবাই আরেকদিন থাকব বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।


বিচ আর হকার মার্কেট

20100418_9999_12 হোটেলের ঠিক উলটো দিকে রাস্তার পাশে বিশাল খোলা পার্কিং লট, সেখান থেকে পায়ে চলা পথ নেমে গেছে বিচের দিকে। পার্কিং লটের ঢোকার মুখে পাশের পাকা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একচালা স্যুভেনির শপ। হরেক রকমের জিনিস, কিছু সেখানকার নিজস্ব তৈরি হলেও বেশির ভাগই ভিয়েতনাম থেকে আনানো। হোটেল থেকে বের হয়ে অরূপ আর অভিক নিচে বিচে চলে গেলে আমরা মার্কেটে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। বড় একটা কাঠের প্লেটে জর্জটাউনের রাস্তা আঁকা, তাতে আবার সাদা ঝিনুক বসানো, দেখেই পছন্দ হলো, আবার ঝিনুক বসানো কাঠের টিস্যু বক্স। দামাদামি করতে যেয়ে দেখলাম দোকানদার বাঙালি। কেনাকাটা সবে মাত্র শুরু হয়েছে তেমন সময় নিচ থেকে ফোন, মামা তাড়াতাড়ি আসেন, গোলাপি সানসেট, আমরা দৌঁড়ালাম।

20100418_9999_5 বিচ সুন্দর, এরইমাঝে জেটস্কির ভমভম আওয়াজ দৃষ্টি সেদিকে টানে। তাকিয়ে দেখি ওর পেছনে দড়িতে বেলুন বেঁধে উড়ছে কয়েকজন। আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে দেখে মাতিস আর রিতা কোমরে দড়ি বেঁধেও উঠতে পারল না। একটা বাঙালি ছেলে ঘোড়া ছুটিয়ে মাতিসকে নিয়ে গেল। আমার ক্যামেরা ব্যস্ত হয়ে উঠার আগেই শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। পেনাং এর বৃষ্টি, কখন আসে কখন যায় কোনোই ঠিক নাই। ছুটলাম সবাই পারের দিকে। ঘোড়ার সহিস ছেলেটা মাতিসকে নিরাপদে পারে পৌঁছে দিয়ে গেছে।


ভারতীয় খাবার, রাতের পেনাং, আর ম্যান ফর ম্যান, লেডিস ফর লেডিস

20100417_9999_18 বৃষ্টি থামতে থামতে রাত নেমে এসেছে পেনাং-এ। রাস্তাঘাট ভেজা, এরই মাঝে লোক চলাচল শুরু হয়েছে আবারো, তিন চাকার রিকশাও দেখলাম কয়েকটা। আশে পাশের দোকানগুলো ঝাঁপ খুলে তৈরী। ঠিক করলাম রাতের খাবার খেয়েই মার্কেটে ঢুকব। কোথাও বেড়াতে গেলে স্থানীয় খাবারের প্রতি একটা পক্ষপাতিত্ব থাকলেও কাছাকাছি ভারতীয় খাবারের দোকান দেখে ঢুকে পড়লাম। নামেই শুধু ভারতীয়, মান আর স্বাদ কিংবা দামের তুলনায় পরিমাণ কোনটাই আমার পছন্দ হয়নি।

Penang street souvenir shop এবারে ঘোরাঘুরি, টিপটিপ বৃষ্টি, নানান জাতের আর পদের শোপিস, ঘড়ি, ঘর সাজানোর সাজসরঞ্জাম, চুলের ফিতা, হারবাল ক্রিম, বাঘ আর বানরের তেল, ট্রাভেল ব্যাগ, জুতা কিংবা স্যান্ডেল, আইসক্রিম, ক্রোকারিজ, টিশার্ট, স্কার্ট, বাটিকের কাপড়, কাঠের কাজ করা লাইট শেড, বই, সিডি, ছোট খাটো বৈদ্যুতিক সামগ্রী কোনো কিছুরই অভাব নেই এই মার্কেটে। এরই মাঝে ব্যাগের ওজন বাড়তে থাকল, সাথে চললো ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক।

20100418_9999_80 আমরা ঘুরছি এক দোকান থেকে অন্য দোকানে। এক পাশে কাগজ-পেন্সিল নিয়ে চিত্রকরের দল বসে গেছে, তাদের সামনে এক তামিল পরিবার মূর্তির মতন বসে আছে। আস্তে আস্তে কাগজে ফুটে উঠছে তাদের চেহারা। পাশেই সিংহলি মালিকাধীন স্যুভেনিরের দোকান তার আলোকসজ্জার গুণেই ভেতরে টেনে নিলো আমাদের। চমৎকার সুন্দর সব জিনিস, দামও তেমন চড়া। অনুমতি নিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। দোকান বন্ধ হবার সময়ও ত্রিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে, অগত্যা আমরা বের হলাম হোটেলে ফিরব বলে। গল্প করতে করতে ফিরছি সবাই, হোটেলের গেটের কাছে আসতেই পাশ থেকে স্থানীয় একজন নিচু গলায় বললো কাম ইন স্যার, ম্যান ফর ম্যান, লেডিস ফর লেডিস।

20100418_9999_64 বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগলেও বুঝলাম ভদ্রলোক পাশের পা টেপা দোকানের। ব্যাংকক, বেইজিং এর মতন মালয়েশিয়ার টুরিস্ট স্পট গুলোতেও পা টেপা দোকানের অভাব নেই। কুয়ালালামপুরের দোকানগুলোর সামনে বড় বড় পোস্টার টানিয়ে পা টেপার বৈজ্ঞানিক দিক ব্যাখ্যা করে ক্রেতা আকর্ষণ করা হয়। আমরা পা টেপাটেপিতে না যেয়ে রঙ্গীন আলো গায়ে মেখে ঘুরতে ঘুরতে হোটেলে ঢুকে গেলাম।


প্রজাপতি আর লাভ লেন

বুকিং এর সময় দেখেছিলাম এ হোটেলের চেক আউট সময় সকাল দশটা, তাই তখনই বলে রেখেছিলাম আমরা বিকেল ৩টায় হোটেল ছাড়বো, এসময় টুরিস্ট কম বলে রাজি হয়েছিলো তখন। সকালে নাস্তা করে আমরা তাই চলে গেলাম প্রজাপতির বাগান দেখতে।

Butterflies from Penang প্রজাপতির বাগান এরা বলে তামান রামা-রামা।আমরা যে রাস্তায় বাটু ফিরিঙ্গি এসেছি সে পথ ধরে আরো ১০ কিমির মতন সামনে এই পার্ক। প্রায় আড়াই একরের এ বাগানে ওদের কথানুযায়ী ১২০ প্রজাতির ৪০০ ধরনের প্রজাপতির সংগ্রহ আছে।

Butterflies from Penang পার্কে ঢোকার মুখেই বানানো পাহাড়ে বসে থাকা বিশাল তিনশিঙা বিটল আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকেই প্রজাপতির ছোঁয়া পেলাম। নানান রঙ, আকৃতি আর ধরনের অগুনতি প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে, প্রত্যেকটাই আলাদা আলাদা সুন্দর। উড়ে এসে গায়ে বসে আবার চলে যায়। কিছু কিছু প্রজাপতি খুব শান্ত হয়ে বসলেও কয়েকটাকে একবারের জন্যও ক্যামেরার ফ্রেমে আনতে পারি নি ওদের ব্যস্ততার জন্য। ছোট্ট এ বাগানের বাড়তি আকর্ষণ এর ভেতরের মিনি জু আর পোকা মাকড়ের জাদুঘর। এছাড়াও স্যুভেনির শপ আর একটা আর্ট গ্যালারিও আছে। জু তে বিটল, শিংওয়ালা কচ্ছপ, স্করপিয়ন আর ড্রাগন দেখলাম। জাদুঘরটা আরো চমৎকার, বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা নানান জাতের পোকামাকড় আর সরীসৃপ বয়ামে রাখা। দু’ঘন্টার চমৎকার সময় কাটিয়ে বাটু ফিরিঙ্গিতে বেলা বারোটার আগেই ফিরে এলাম। রিতা আর মাতিসকে হোটেলে রেখে আমরা তিনজন চলে এলাম জর্জটাউনে।

20100419_9999_153 জর্জটাউনের আধুনিক ইতিহাস সিঙ্গাপুরের চাইতে পুরোনো। জর্জটাউনের জন্ম ১৭৮৬ সালে আর সিঙ্গাপুরে বৃটিশরা আসে ১৮১৯ সালে। তারও কিছুকাল পর বৃটিশরা এ দুটো অঞ্চলকে সিটি হিসাবে ঘোষণা করে। বৃটিশদের দখলে যাবার আগে এ দুটোই যথাক্রমে কেদারের সুলতান আর জোহরের সুলতানদের দখলে ছিলো। বৃটিশদের কাছে সে সময় সিঙ্গাপুরের চাইতে জর্জটাউনের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং এর পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানান মেরুকরণে জর্জটাউন সিঙ্গাপুরের কাছে তার অবস্থান হারায় এবং ২০০৮ সালে এর পুরোনো অঞ্চলগুলো ইউনেস্কো হেরিটেজ হিসাবে ঘোষিত হয়।

20100419_9999_131 স্থানীয় মুসলমান, ভারতীয় তামিল আর চাইনিজ বংশোদ্ভূতদের নিয়ে জর্জটাউন। হাতে সময় কম বলে স্বল্প সময়ে শুধুমাত্র দু একটা রাস্তা ঘুরে দেখা ছাড়া আর কিছুই হলো না। ছবি তোলার জন্য জর্জটাউনে কমপক্ষে দিন দুই থাকা উচিত।

এবারে ফেরার পালা

20100419_9999_2 বিকেল ৩টায় হোটেল ছেড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরতি যাত্রায় কুয়ালালামপুরে। এবারে রাস্তায় ভালোই বৃষ্টি পেয়েছিলাম। মাতিসের টুইন টাওয়ার দেখার শখ মিটিয়েছে অরূপ ওর বাসায় ফেরার পথে টুইন টাওয়ার ঘুরিয়ে এনে। রাতে গোছগাছ সেরে খুব ভোরে যখন অরূপ মাশীদের বাসা ছাড়লাম মাতিস তখন তার সেই চেনা ডায়লগ ছাড়লো “বাবা, আমরা কী আবার এখানে আসবো?” উত্তর দিতে পারি নি, আসলে এ উত্তর আমার জানা নেই।

শুক্রবার, জুন ০৪, ২০১০

মালয়েশিয়া...আ আ...আ......আ...

ভূমিকা

Matisse and Rita আমার ছেলের স্কুল ছুটি। আগের বার ছুটিতে মালয়েশিয়া ঘুরিয়ে আনার কথা থাকলেও হয়ে ওঠে নি, তাই এবারে ছেলের আবদারে বাতাস লেগেছে ওর মায়ের একই সময় ছুটি মিলে যাওয়াতে। যেই সেই ছুটি না, চাকরি ছেড়ে দিয়ে একেবারে আড়াইমাসের জন্য। সব যখন ঠিকঠাক খেয়াল করলাম ভিসার জন্য হাতে সময় নেই, এখানকার মালয়েশিয়ান এম্বেসি তিন দিন সময় নেয়, কিন্তু যাবার আগে হাতে সময় মাত্র দুই দিন। একদিনের ভেতর যদি না দেয় তাহলে ঠিক করেছি ভিসা ছাড়াই যাত্রা করব, ওরা এয়ারপোর্ট থেকে ভিসা দেয়, ভরসা সেটাই। আমাদের অবাক করে দিয়ে একদিনেই এম্বেসি থেকে মাল্টিপল এন্ট্রি দিয়ে দিলো। এপ্রিলের ১৩ তারিখ রাতে এয়ারপোর্ট চলে এলাম বুকিং ছাড়াই। চোখের সামনে দিয়ে একেক করে লাইনের সবাই ভেতরে চলে গেলে চেকিং স্টাফ হাসিমুখে আমাদের জানালো বেটার টুমরো। এমন হতে পারে ভেবে পার্কিং এ গাড়ি রেখে দিয়েছিলাম, কিছুক্ষণ গল্প করে পরেরদিন ফ্লাইটের অবস্থার খোঁজ নিয়ে ফেরার পথে বনানী পৌঁছানো মাত্র এয়ারপোর্ট থেকে ফোন “আপনারা দশ মিনিটের ভেতর আসতে পারবেন?” পারবো বলেই গাড়ি ঘুরিয়ে ছুটলাম আবারো এয়ারপোর্ট, যেয়ে শুনলাম বিমান টারমাক ছেড়ে উড়াল দেবার ঠিক আগেই ৫ জন অসুস্থ বোধ করাতেই আমাদের কপাল খুলেছে।

এই অসুস্থতার পেছনের খবর আসলে অন্যরকম। ইদানীং বাঙ্গালি লেবারদের মালয় ভিসা বন্ধ থাকাতে প্রায় সবাই ভিসিট বা টুরিষ্ট ভিসা কিংবা জাল ভিসায় কুয়ালালামপুর যায়। সেখানে এয়ারপোর্টে কাজ করে এমন দালালদের মাধ্যমে মালয় ইমিগ্রেশনের সহায়তায় একবার এয়ারপোর্ট পেরুতে পারলেই নিশ্চিত। ঢাকা থেকে দেরীতে ছাড়াতে ওদিককার ইমিগ্রেশন সেকশনের শিফট বদলীর গ্যাড়াকলে পরে যাবার ভয়েই এই অসুস্থতা।


একবছর পর আবারো

ভোরে এয়ারপোর্টে নামার আগেই বিমানের গেটে পরিচিত একজনের মাধ্যমে মোবাইল কার্ড পেলাম, ঢাকার তুলনায় সস্তা না হলেও ডিজিটাল যুগে এই মোবাইলের উপর আমাদের নির্ভরশীলতার বিপরীতে খরচটা গায়ে মাখার মতন না। ইমিগ্রেশন ছেড়ে বাইরে এসে অরূপকে খুঁজে নিলাম, সাথে সাথে মনে পড়লো ঠিক একবছর আগেও অরূপ এয়ারপোর্ট এসেছিলো আমাকে তুলে নিতে। সেবার ছিলাম একা।


তারার পাহাড়ে সোনালি মানব

আজ পহেলা বোশেখ। অরূপ মাশীদের দরজায় দেখলাম দেশি মুখোশের ছবি লাগানো। দুবছর আগেও প্রতি বছর পহেলা বোশেখের আগেরদিন চারুকলায় যেয়ে মুখোশের ছবি তুলতাম। জমতে জমতে কয়েক’শ মুখোশের ছবি জমিয়েছি। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে স্মৃতি হাতড়ে মুখোশগুলো দেখে নিলাম একবার। এরপর ঘুম।

ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম, মাতিসের চমৎকার কিছু পোট্রেট তুলে দিলো অরূপ। বিকেলের দিকে বের হয়ে ‘ইকিয়া’তে ঢুকেছিলাম, কত বড় যাবে না, সন্ধ্যার পর ওখান থেকে বের হবার সময় মনে হলো পুরোটা দেখা হয় নি। চলে এলাম বুকিত বিনতাং এ, মালয় ভাষায় বুকিত মানে পাহাড় আর বিনতাং হলো তারা। তারার পাহাড়ের এ এলাকাটা কুয়ালালামপুর শহরকেন্দ্রের কাছেই। সারাদিন ব্যস্ত থাকার পরও এর আসল রূপ খোলে মাঝরাতে। পর্যটক আকর্ষণের সমস্ত কিছুই এ এলাকাটা ঘিরে। সব ধরনের হোটেল খাবার দোকান আর শপিং মল কিংবা ফুটপাতের হকার, সবই মিলে এখানে।

বুকিত বিনতাং এর রাস্তাতেই দেখা পেলাম ‘গোল্ড ম্যানের’, কিছুদিন আগে অরূপের সারাদিনে করা চমৎকার কিছু কাজ দেখেছিলাম এ সোনালি মানবের উপর, এবারে সামনে থেকে দেখলাম। পাশাপাশি রুপালি মানবীরও সাক্ষাৎ মিললো। সারা শরীরে রঙ মেখে ভোর থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত পর্যটকদের আনন্দ দেয়। বিনিময়ে যা পায় তাতে সংসারের খরচ মেটে কি না কে জানে?


তামার খনি আর পাথরের গুহা

Green Lizard from Kualalumpur দ্বিতীয় দিন সকালে চলে এলাম সানওয়ে লেগুনে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কী থেকে কী বানানো যায় তার চমৎকার উদাহারণ এই লেগুন। একসময় এলাকাটা ছিলো তামার খনি, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তামা আর টিন তোলা হতো এখান থেকে। সেসব শেষ হলে পরিত্যক্ত অবস্থাতেই ছিলো এলাকাটা, ৯২/৯৩ সালে প্রথম এ নিচু এলাকাটাতে ছোট্ট ওয়াটার পার্ক গড়ে তোলা হয়। এরপর ২০০৮ সালে এসে ৮০ একরের বর্তমান থিম পার্কের চেহারা নেয় সানওয়ে লেগুন এবং এর আশপাশ মিলে পুরো একটা পরিকল্পিত শহরের জন্ম নেয়।

20100415_9999_48 সারাদিন পানিতে দাপাদাপি করে কাটিয়েছি সানওয়েতে। এ পার্কে প্রচুর বাঙালি কাজ করেন। বেশির ভাগই পাশের সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, এছাড়া কন্‌জারভেটর হিসাবেও আছেন কয়েকজন। এদেরই একজন বিভিন্ন পাখি আর সরিসৃপ ঘুরিয়ে দেখালেন, গলায় বার্মিজ অজগর পেঁচিয়ে ছবি তুলতেও সাহায্য করলেন।

Lord Murugan Statue এর পরদিন গেলাম বাটু কেভ দেখতে। বাটু কেভ অর্থ পাথরের গুহা। চুনাপাথরের এ পাহাড় ৪০কোটি বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়। বয়সের ভারে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ ধ্বসে পড়ে নানান আকৃতির গুহার সৃষ্টি হয়েছে। এর ভেতর সবচাইতে বড় যেটা মেঝে থেকে উপরের উচ্চতা ৩০০ ফুটের উপর। সিঙ্গাপুরে জন্ম নেয়া তামিল হিন্দু থাম্বুস্বামী কৃষ্ণ ১৮৯১ সালে এখানে তামিল হিন্দুদের যুদ্ধ দেবতা মুরুগানের (কার্তিকের পুত্র) মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

২৭২টা সিঁড়ি পেরিয়ে মূল মন্দিরে যাওয়াটা অনেকের জন্য কষ্টকর হলেও প্রতি বছর প্রচুর হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে তামিলরা এখানে পূজা দিতে আসেন। জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি মাসে থাইপুসাম উৎসবের সময় এটা মেলায় রূপ নেয়।

272 steps দুপুরের কড়া রোদে ঘামতে ঘামতে উপরে উঠে মূল গুহা ঘুরে দেখলাম। ছাদের ফাঁক ফোকর দিয়ে আলো এসে নিচের পাকা মেঝেতে পড়ছে। চারিদিকে বিভিন্ন আকৃতির ঝুলন্ত পাহাড়ের খাঁজ আলো আঁধারিতে অদ্ভুতাকার নিয়ে আছে, এর ভেতর বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। আর আছে বানর, অগণিত। দুয়েকটা দোকান, হালকা পানীয় আর পূজার জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো।




অবশেষে পেনাং যাচ্ছি

20100418_9999_11 এখানে যাবো না সেখানে যাবো এই করতে করতে কুয়ালালামপুরে তিন রাত কেটে গেল , এর মাঝে তামার খনি আর পাথরের গুহা ঘুরে এলেও পেনাং যাওয়ার ব্যাপারটা এড়িয়ে যাচ্ছিলাম বারবার। সেখানে যাবার উদ্দেশ্য স্নোরক্লিং করা। বিদেশ বিভুঁইয়ে দুজন সাঁতার না জানাকে নিয়ে স্নোরক্লিং করাটা একটু সমস্যাই মনে হয়েছিলো আমার কাছে। যাওয়া হবে না ভেবে ছেলের কালো মুখ দেখেই হয়তো অরূপ ঠিক করে ফেললো আমাদের সাথে সেও পেনাং যাবে।

আর যায় কোথায়, আমরা এসেছি শুনে আগেরদিন থেকেই অরূপ-মাশীদদের ছোট্ট বাসায় বর্তমানে কুয়ালালামপুর প্রবাসী ফটোগ্রাফার অভীক আস্তানা গেড়েছে, কিছুটা ছন্নছাড়া অভীক পেনাং যাবার কথা শুনেই লাফিয়ে উঠে পেট খারাপের অজুহাত তুলে অফিস কামাই দিয়ে দল ভারী করলো আমাদের। ঠিক হলো পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অরূপের ছোট্ট গাড়িতে রওনা হব সবাই।


রক বনাম রবীন্দ্র সংগীত

পুলাউ পেনাং, স্থানীয় ভাষায় পুলাউ মানে দ্বীপ আর পেনাং মানে সুপারি। কুয়ালালামপুর থেকে উত্তরে এ দ্বীপ গাড়িতে চার/পাঁচ ঘন্টার পথ। কখনো সমতল কখনো পাহাড়ি বা বন কিংবা টানেলের ভেতর দিয়ে পুরো যাত্রা পথেই রাস্তার দুপাশের চিত্র প্রায়শই বদলে যেতে থাকে। আর সাথে যদি থাকে অভীকের মতন কেউ, ভ্রমণ তাতে কারো কাছে যন্ত্রণাদায়ক মনে হলেও একবার রক পরক্ষণেই রবীন্দ্র সংগীত শুনতে আমাদের অন্তত খারাপ লাগে নি মোটেই। গাড়ি চালাচ্ছিলো অরূপ, ঘন্টা খানিকের দূরত্বে থেকে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে কোথায় যেনো ফোন করলো, কথা বার্তায় বুঝলাম স্নোরক্লিং এর টিকিট দেয় যে অফিস সেখানে ফোন করে বিকেল পাঁচটার পরও কিছুক্ষণ খোলা রেখে আমাদের অপেক্ষায় থাকতে বলছে সে। আমরা স্পষ্ট ওপাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠ শুনলাম “ওকে নো প্রব্লেম”।


সালাহ্‌ সাতু কারা

এর আধঘণ্টা পর পেনাং ব্রিজের উপর আমরা, ১৩ কিলোমিটার লম্বা ব্রিজটা মুলভূমির সাথে পেনাং কে যোগ করেছে সমুদ্রের উপর দিয়ে। দুপাশের দেয়ালের জন্য ব্রিজ থেকে সমুদ্র দেখার সৌন্দর্য অনেক কমে গেছে। ব্রিজ পেরিয়ে মূল দ্বীপে ঢুকে পড়লাম একসময়। দ্বীপটা মালয়েশিয়ার একটা রাজ্যও বটে, রাজধানী জর্জটাউন, পুরোনো এ শহরটির গুরুত্ব একসময় সিঙ্গাপুরের চাইতে বেশি ছিলো, যোগাযোগ আর সুরক্ষা সুবিধার জন্য বৃটিশরা আস্তে আস্তে সিঙ্গাপুরের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকলে জর্জটাউনের গুরুত্ব কমে যায়।

20100419_9999_167 ব্রিজ পেরিয়ে জর্জটাউনে যাবার রাস্তা ডানে ফেলে মোটামুটি পাহাড় ঘেঁষে গাড়ি চললো। কিছুক্ষণ পর খেয়াল হলো ঘুরে ফিরে রাস্তার নাম একই “সালাহ্‌ সাতু কারা”, এদিকে অরূপের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হেসে বললো এর অর্থ “একদিকে চলাচল”। আমরাও হেসে নিলাম। হাসতে হাসতেই পৌঁছে গেলাম স্নোরক্লিং এর টিকিট কেনার অফিসে। বিকেল পাঁচে বন্ধ হবার কথা থাকলেও আমরা আসবো বলে ছয়টাতেও খোলা ছিলো এর দরজা।

রবিবার, মে ০২, ২০১০

“Allat!!” Sundarban

Only a few tourists were lucky enough to be able to see a tiger face to face in Sundarban. Someone who has faced a tiger, I haven’t heard of him yet. But of course, every time I’ve been there I’ve heard of people who were attacked. Sometimes the dead body could be brought back, sometimes not. This time we heard of three attacks. All three were fresh attacks. Two came back dead, one survived badly injured. Every time there is an attack, Bappi-da (our guide) calls the newspaper. They print the news as fresh stories. The last one I’ve heard of was horrible. The shredded dead body was so badly mutilated that it had to be bundled in a towel to be taken to his home. The same trawler that carried the dead body came to rescue us from the middle of the river where we were stuck because the engine of our boat went dead. It came to us even before cleaning the vomit stains that the batman spewed on seeing the dead body.
I will always remember this tour for many incidents like this. We went to Dubla’r char to see the Raasmela*. We’ve heard so much of this fair but we had to come back before the fair with a broken heart. Actually, it’s better to stay at Sundarban to see Sundarban.
I am quite skeptic about the Sundarban tours with the tour companies. I mean, I was never quite satisfied with them. A tour with them is like a boat ride with lots of rules and regulations in it. So, I am more interested in finding out about new places through goggling and exploring them.
Today I’ll tell you a story full of fear, anxiety, courage and adventure. Hiron Point** is one of the elitist places among the forest areas. Hiron point in Sundarban is only 25 mile from Indian border. Apart from the forest office, a branch office of Mongla port and Navy camp is also there. The part of the forest at the north of the forest office across the river is called Kewrashuti. May be because of so many Kewra trees are there. The small area measuring only two miles by the east west and half a mile by the north south is encircled by the river. I found some specialties of the place while I googled about it. Like, there is a small sweet water pond at the middle with very little trees around it and stuffs like this. All of which indicates the presence of deer. Tiger should be there where deer is. Tour companies usually avoid this places, even our Bappida was also not very interested. He granted us only two hours in the early morning to roam the place, mostly due my stubbornness. In my numerous trips in the mangrove, the most beautiful pictures are from this place.
After being there, I decided to cut short the trip to Dubla’r char and spend some more time here. So, we left Dubla’r char before the beginning of the main program. The tide was already low at this point. I noticed that the water level sinking while Hiron Point was almost two kilometers away. Our trawler got stuck in the sand. There is no way of knowing that water is only two/two and half feet deep here. We figured out that it would take almost three hours for the next high tide. So, we stepped down in the water.
We had to tread through shoulder deep water to go to the place across Hiron point. That would take more time and the camera could get wet. So, we made a new plan. If we walk straight over the char and cross the forest, we will reach the tree-engulfed field behind the three offices. There was a sweet water pond, the helipad beside that and the pond of forest office right across that.
It shouldn’t take more than two and a half hours to take pictures and stroll up to there. Once they saw us, our guard Emdad and Rezaul also came down with rifles in their hand. We all bared our feet to step in the water. Small, sharp grass stung like thorns in our feet. It was a long and painful way. We walked cautiously. Sometimes deer passed by. We watch them or take pictures. We reached the edge of the forest like that. Emdad again reminded us the forest rules. Rezaul kept his rifle handy.
Kewraban was muddy and a bit runny. Emdad was in front of me, others were behind me and Rezaul was at the rear end. I stepped wherever Emdad stepped. It was less likely to be stung like that. It took half hour only to cross hundred meters. The port office could be seen at right and the tower was above. After a few steps, I called “Emdad?” He read my mind and agreed, “Right boss. It isn’t safe this way.” Although he came to Hiron Point, he has never been here yet. We considered my google knowledge and Emdad’s experience and decided that we will go by the thorny trees through west and reach the helipad. From there, we would turn to north. We explored according to that. Rezaul and one of us were just crossing the thorny trees then. Another guy with us said, “There might be deer near. Let me switch to my tele-lens.” I pointed a place ahead and said, “Do it there.” As he knelt down there, we heard the blood-chilling roar. It came from grassy land that was only around five yard to our left.
Many things happened simultaneously in a single moment. Emdad hollered “Allat!”(Not alert) and pointed the rifle. The camera was already pointed at the left, my right hand clicked it. The person beside me quickly knelt down with lens in one hand and camera in other. Two people behind us stood closer and Rezaul’s rifle moved toward the sound soundlessly. It seemed like something has moved. Then everything was silent. Even the air was mute. Emdad broke the silence and ordered “Walk forward fast. It’s gone.” I looked at the screen; it was only a picture of tall grass and plants. Seeing the footprint on the soil, Emdad said with expertise that it was an adult tiger, almost three and half feet tall. Still it hid itself so well that none of us noticed.
We reached the forest office without any further trouble. Two people from the port office were fishing. They also came back with us.
...............
After the local people heard whole story explicitly, the assertion was like this……
The tiger decided to attack us when it saw us coming from the sandy field. When a tiger wants to attack some one or something, it usually follows them for a while. Then a pick place for attack and wait. When we were walking through the forest, it was waiting in its hiding place to attack us. Sometimes due some unexpected behavior from the prey, tigers especially Royal Bengal Tigers change their mind to attack.
It might have happened to us due to three reasons. Firstly, we walked slowly inside the forest but quickly outside the forest. Second, we entered the bush and then again came out. Lastly, our friend tried to change his lens. Many thought that he was the actual target of the tiger; but when he knelt to change his lens, the tiger roared in disgust and left. According to them, if the tiger were not in the mood to attack, we would have seen it for sure.
………………………………………………………………………
*Raas Mela, an occasion of religious festival of the Hindu community people.
**Hiran Point, This is another tourist spot in Sundarban. It is called the world heritage state. You can enjoy the beauty of wild nature and dotted dears walking and running in Hiron Point. Coordinates: 21°48'57"N 89°27'41"E



Kewrashuti
Inside Sundarban

Kewrashuti, Sundarban

Kewrashuti, Sundarban

Kewrashuti, Sundarban

char Dubla
A lonly boy

Dry Fish preparation at Dubla

people coming to Dubla 'Ras Mela' for  worship

20091101_7765

20091101_7772

low tide Hiron Point
20091101_7823

Our entry point at Hiron Point
Hironpoint, Sundarban

Deer
Spotted Deer (Axis axis)

মঙ্গলবার, মার্চ ২৩, ২০১০

চর আলেকজান্ডার

ভোর চারটা। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। মনে হচ্ছে এখনও দৌড়ের উপর, গাড়ি চালাচ্ছি, একবার ডানে আরেকবার বামে ঘুরছি আমি। বালিশে মাথা রেখে মনে হলো বিছানা দুলছে। উঠে যেয়ে এসি ছেড়ে দিলাম, একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেলো ঘরটা জুড়ে। উলটো দিক থেকে গুনতে শুরু করলাম এবার একশো, নিরানব্বই, আটানব্বই, সাতানব্বই...
বেলা এগারোটা। চর আলেকজান্ডার। একটু আগে ঘুম থেকে উঠে নাস্তার টেবিলে, সবার নাস্তা সারা হয়ে গেছে এরই মাঝে। মাতিস দৌড়াচ্ছে এ ঘর থেকে সে ঘরে, আবার দৌঁড়ে বাইরে গেলো, আমার নাস্তা প্রায় শেষ এমন সময় কাছে এসে বললো “বাবা শব্দটা কীসের?” আমি বললাম ঝিঁ ঝিঁ পোকা।
মফস্বল শহরের পাকা বাড়ি, যখন বানানো হয় নদী ছিল পনেরো কিলোমিটার দূরে। এখন এক কিলোমিটারও হবে না, তাই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একতলা বাড়ি উপরে বাড়েনি। বিশাল এলাকা নিয়ে বাংলো মতন বাড়িটার সামনে পেছনে দুটো পুকুর, বৃষ্টি নাই বলে নিচের মাটি দেখা যায়। আর আছে গাছ, আম, জাম্বুরা, কাঠ বাদাম, কামরাঙ্গা, সুপারি, নারকেল কত জাতেরই না গাছ দেখলাম সেখানে। শাঁসওয়ালা ডাবের পানি হাতে মাতিসের সাথে বাইরে এলাম, সামনে পেছনে, উপরে নিচে একটানা ডেকে গেলেও একটা ঝিঁ ঝিঁ পোকারও সন্ধান করতে পারলাম না।
‘৭০ এর ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের এ এলাকার উপর দিয়ে তাণ্ডব বয়ে গিয়েছিল। আমি তখন ছোট। থাকতাম ময়মনসিংহে। মনে আছে সকাল থেকেই চারদিক ছিল সন্ধ্যা সন্ধ্যা, ঘন নীল আকাশ আস্তে আস্তে নেমে আসছিল নিচের দিকে, সেই নীলাকাশ কালো হবার আগেই স্কুল ছুটি হয়ে গেলে বাসায় ফিরতে ফিরতে চারদিক অন্ধকার। পরবর্তী কয়েকদিন বড়োভাই পত্রিকা কেটে কেটে ঝড়ের ছবি জমিয়েছে, ইত্তেফাক, আজাদ এসব পত্রিকার পাতায় পাতায় বীভৎস সেসব ছবি, পাতাহীন বিশাল বৃক্ষের চূড়ায় পতাকার মতো আটকে আছে টিনের চাল কিংবা দুলছে মানুষের লাশ। চর আলেকজান্ডারের নাম তখনই শোনা। ইচ্ছা ছিল গৃহকর্তার থেকে সেদিনের বিবরণ শুনব, বয়সের ভারে চোখ আর কান দুটোতেই উনার সমস্যা থাকায় সে সুযোগ হলো না। বাড়ির বড়ো ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হান্নান ভাই সুইডেন প্রবাসী, জুনে ফেরার কথা, ইচ্ছাটা তখনকার জন্য তুলে রেখে বর্তমানে ফিরে এলাম।
কানাডা প্রবাসী মাতিসের বড়োমামীদের পৈত্রিক নিবাস এখানে। মার্চের ১৮ তারিখ বৃহস্পতিবার অফিস করে কাপড় না বদলেই রওয়ানা দিয়েছিলাম। তখন বিকেল ছয়টা, ধারণা পেয়েছিলাম রাত বারোটার আগেই পৌঁছে যেতে পারি আলেকজান্ডার। কিন্তু রাত আটটা বেজে গেলেও যখন কাচপুর সেতু পেরুতে পারলাম না বুঝলাম দুঃখ আছে কপালে। কাচপুর পেরিয়ে কুমিল্লা, সেখান থেকে লাকসাম, সোনাইমুড়ি, বেগমগঞ্জ হয়ে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত চলে এলাম মোটামুটি শান্তভাবেই। সামনের সিট এলিয়ে মাতিস নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। পেছনে রিতা আর মাতিসের নানা। টুকটাক কথাবার্তা হচ্ছে আমাদের মাঝে, সমস্তই আমি যেন গাড়ি চালাতে যেয়ে ঘুমিয়ে না পড়ি সেজন্য। লক্ষ্মীপুর এসে শুনলাম আরো চুয়াল্লিশ কিলোমিটার যেতে হবে। এই সেই চুয়াল্লিশ কিলোমিটার, মনে হলো এবড়ো খেবড়ো উঁচু নিচু মাটির রাস্তায় খুব জোরে চালানো গরুর গাড়িতে বসে আছি। প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে ঝাঁকি খেতে খেতে রাত তিনটা নাগাদ সে রাস্তাও পেরিয়ে সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে আমি তখন ভাবছি কয়েকঘন্টা পরই আবার এ রাস্তাতেই আমাকে ফিরে যেতে হবে।
শুক্রবারের দুপুর, চারদিক প্রচণ্ড গরমের মাঝে বের হলাম মেঘনার মোহনা দেখব বলে। বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেখানে সরকারি রাস্তা এসে মেঘনায় ক্রমাগত বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম এর বিশালত্ব। আমার সামনে তিনদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু পানি আর পানি, সামনের নীল পানি দৃষ্টি সীমার ওপারে ধূসর হতে হতে মিশে গেছে আকাশের সাথে। কড়া রোদে আকাশে মেঘ নেই, বর্ণ নেই। নদী আর আকাশের সীমানা তাই আলাদা করা যায় না। পায়ের নিচে ঢেউ এসে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে মাটি সরিয়ে নিয়ে যায়। সে মাটির রং কালো, মাটি উর্বর। এখানে পানির গভীরতা সর্বোচ্চ দুই হাজার ফুটের কাছাকাছি।
আমরা সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। কত দেশ কত জনপদ পাড়ি দিয়ে, কতজনের দুঃখ আর ভালোবাসা বুকে নিয়ে মেঘনা এসে মিশে যাচ্ছে সাগরে। গঙ্গা, যমুনা আর ব্রহ্মপুত্রের প্রায় সব পানি যে ধারণ করতে পারে তার বিশালত্ব কীভাবে কল্পনা করি আমি? বিশ্বের সবচাইতে চওড়া নদীগুলোর একটি এই মেঘনা এখানে প্রায় ১৫কিলোমিটারের মতন চওড়া ভাবতেও কেমন যেন লাগে।
আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান, দুটো বেঞ্চ আর একটা টুল। মাতিস সেই কখন থেকে টুলে বসে আছে, রোদে পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু উঠার নাম নেই, তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, সেদিকে একটার পর একটা ঢেউ লাখ লাখ গ্যালন পানি নিয়ে ফেলছে সমুদ্রে, ঢেউ এর মাথায় মাঝে মাঝেই ভেসে উঠছে শুশুক। সে বসে আছে, আমিও যেয়ে বসলাম ওর পাশে। আস্তে করে মাতিস আমাকে বললো “বাবা, আমরা আর কোনোদিন কি এখানে আসব?’
আমাদের ফিরতে হয়, ফিরতে হয় কিছু মন্ত্রমুগ্ধ সুন্দর সময়ের স্মৃতি নিয়ে, যেই স্মৃতি একসময় গল্প হয়ে ভেসে বেড়াবে প্রজন্মান্তরে। তবে ফেরাটা অসহনীয় ছিল না মোটেই। মেঘনার মোহনা দর্শন সাথে আলেকজান্ডারের মহিষের দুধের দই আর ইলিশের স্বাদ ফেরার পুরোটা পথ যেভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তাতে ঢাকায় ফিরেও মনে হচ্ছিল আবারো যাওয়া যেতে পারে সেখানে।



20100319_9623

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১০

পাত্রখোলা আর সাতছড়ি

চারদিক নিশ্চুপ, অন্ধকার, বাগানের ভেতরকার সবচাইতে উঁচু পাহাড়ের উপর বিশালকায় বাংলোর আশেপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা বিরামহীন শীষ ছাড়া শোনা যায় রাত জাগা কাঠ ঠোকরার ঠক ঠক। হিম হিম ঠাণ্ডায় স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে শুয়ে নিদ্রাদেবীকে আকর্ষণের চেষ্টা সবেমাত্র সফল হতে যাচ্ছে তেমন সময় আদিবাসী গার্ডের ভাঙা গলা বেজে উঠে। নিশিপাওয়া মানুষের মতো বিছানা ছেড়ে উঠে আসি এক এক করে। হেঁটে হেঁটে বাংলোর পেছনে এসে আবিষ্কার করি চারজন আদিবাসী আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসে গান গাইছে
...তেরা সিথা নয়নে কাজল ক্যান ছোড়ি বুঝায়া বোল আধা দিনে হবি ডামাডোল
ওরে তোর নয়নে পানি ঝিলিমিলি, ছাড়িয়া নামি হাঁটু পানি
আমি বসি সিনান করি ক্যামনে শুকাই গতর খানি...

রাত আস্তে আস্তে বাড়ে, কিন্তু সময় থেমে থাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে বসে গান শুনি, স্থানীয় ভাষার গানের কলি আবার বাংলায় ভাষান্তরিত হয়। গানের রসের সাথে লবণ দেয়া সোনালী রংয়ের চায়ে হাফহাতা গেঞ্জী পেরিয়ে শীত কামড়ে ধরে না।

.........
পাত্রখোলা চা বাগান, নাম যেমন সুন্দর তেমন সুন্দর এর পরিবেশ আর মানুষ। ঠিক সন্ধায় যখন আরো অগুনতি বাগান পেরিয়ে পাত্রখোলায় গাড়ি ঢুকলো এর ব্যবস্থাপক সাকলাইন আমাদের চা খাইয়েই মাধবপুর লেক দেখাতে নিয়ে গেলেন আর আফসোস করতে লাগলেন আজ কেন আকাশে চাঁদ নেই। আমরা আফসোস করি না। অন্ধকার নেমে এলেও আকাশের শেষ লাল আভা লেকের পানিতে ভেসে থাকা গোলাপী পদ্মের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একসময় মিলিয়ে যায়, এ সৌন্দর্যের সাথে আফসোস থাকে না। আমরা ফিরে আসি। বাংলোর বিশাল বারান্দায় নিচু একটা টেবিলের চারপাশে গোল করে সাজানো চেয়ারে আলো না জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করে সারাদিনের ক্লান্তি সরিয়ে দেবার চেষ্টা করি। চোখে ভেসে থাকে বাতাসে দুলতে থাকা পদ্মের নাচন, পদ্মের রঙ হয় একবার সাদা একবার সোনালি, পদ্ম উঠে আসে আমাদের হাতে, সোনালি তরল হয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। চুপ হয়ে থাকি আমরা, ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যায় বাদুড়, একটা লক্ষ্মীপেঁচা ডেকে উঠে, অনুভবে অনুভবে সবার হৃদয়ের শূন্যতায় উজানগাঁ’র গলা হাহাকার নামিয়ে আনে, আমরা সবাই হয়ে যাই উকিল মুন্সি “...তুমি আমি জনমভরা ছিলাম মাখামাখি/আজ কেনো হইলে নিরল মেলো দুটি আখি রে পাখি... শোয়া চান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকী....।

আমরা কেউই কথা বলি না, এমনকি বেশি কথা বলার সোহেল ভাইও না। তারপরও উঠতে হয়, রাতের খাবারের আয়োজন নিজের বাংলোতে করেছে সাকলাইন। এক গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে রওনা দিই। পাহাড়ি রাস্তায় উঁচু থেকে গাড়ি ঝাঁপ দিলে বাস্তবে ফিরে আসি সবাই। কেউ কোমর আর কেউ কেউ মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঝাল ঝাল মুরগির মাংস দিয়ে পেট পুরে ভাত খাই। আমাদের ঘুম পায়।

.........
ভোরে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। পুরোনো বিশাল দরজা খুলে বাইরে বেরোলেই ভেজা বাতাসের ছোঁয়া পাই। বারান্দা থেকে দৌড়ে পালায় চারটা কাঠবেড়ালী। খাবারের খোঁজে পাখিগুলো কিচির মিচির করতে থাকে। আমি একা একা হাঁটি, পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে থাকি, বৃষ্টিহীন প্রকৃতিতে চা বাগান ধুসর বর্ণের, পূবদিকে দূরে একসারি ছায়া গাছ নিচে আসমানী রংয়ের কুয়াশা ধরে রাখে, সূর্যের আলো তেছরা ভাবে এসে সে রং ফালি ফালি করে কেটে দিয়ে যায়, আমি দেখতে থাকি। এক এক করে সবাই এসে যোগ দেয় আমার সাথে। মাতিস তার ক্যামেরা নিয়ে এখানে ওখানে ছুটে বেড়ায়, কোন সৌন্দর্য রেখে কোনটা ধরবে বুঝতে পারে না।


ধলুয়া কামালপুর সীমান্তের এই বাগানের ভারতীয় অংশে এতদিন শুয়ে ছিলেন আমাদের এক বীরশ্রেষ্ঠ। বাগানের কাছাকাছি সীমানা দেয়া বধ্যভূমি। নানা অজানা শহীদদের সন্মান জানাতেই হয়ত প্রকৃতি নিজের হাতে গড়ে তুলেছে এই বাগান। এরই মাঝে নাস্তার ডাক আসে। নাস্তা করেই আবার ছুটব।


.........
পাত্রখোলাকে বিদায় না জানিয়েই গাড়ি নিয়ে ছুটলাম ফুলবাড়ি, প্রাক্তন বিচারক প্রকৃতির প্রেমে সরকারি চাকুরী থেকে ইস্তফা নিয়ে এখন ফুলবাড়ি চা বাগানের দায়িত্বে। আমাদের আসার কথা শুনেই চা খেয়ে যাবার নেমন্তন্ন দিলেন। মাগুড়ছড়ায় বিস্ফোরণে যেখানে গর্ত তৈরি হয়েছিল ফুলবাড়ি বাগানের সে অংশে এখন পদ্ম ফুটে আছে। ভদ্রলোকের ফুলের সখ। চমৎকার সাজিয়েছেন ফুলের বাগান, তাতে প্রজাপতি আর মৌমাছিরা ঘুরে বেড়ায়। আমিও ঘুরতে থাকলাম ক্যামেরা নিয়ে। নানান রঙের আর বর্ণের ফুল, সব নাম জানি না। একদিন পূর্ণিমা রাতে উনার বাংলোতে থাকার কথা বললেন, বাউলের আসর বসাবেন। আমরা মানা করি না। হেঁটে হেঁটে গেলাম বাংলোর কাছে।


এখান থেকে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে গাড়ি ছোটালাম। লাউয়াছড়ার মুল অংশে ভেতরে খাসিয়া রাজার বাড়ি, পিকনিক করতে আসা হাজার মানুষের ভীড় আর লাউডস্পিকারের শব্দ সহ্য করে বনে ঢোকা আর তার চাইতে লোভনীয় খাসিয়া রাজার বাড়িতে চা খাবার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে লাউয়াছড়া পেরিয়ে শ্রীমঙ্গল ছাড়িয়ে সাতছড়ির দিকে যেতে থাকলাম।


আজকের রাত কাটাব সাতছড়িতে। স্থানীয় মন্ত্রীর অনির্ধারিত যাত্রা বিরতির কারণে সাতছড়ির বনবিভাগের বাংলোতে বেশ ভীড়। অবশ্য আমরা চলে আসাতে মিনিট পাঁচেকের ভেতর উনি চলে গেলেন।


বিকেলে ঢুকে গেলাম বনের ভেতর। ছবির মতন সুন্দর বন, নাম না জানা গাছ, তাতে পাখির বাসা। সূর্য ডোবার আগে আগেই ঘরে ফিরতে থাকল। কিচির মিচির করে খোঁজ নিলো আর কেউ বাকি রয়ে গেলো কি না। একটা বনমোরগ একটানা অনেকক্ষণ ডেকে গেলো। আমরা হাঁটলাম, হাঁটতে হাঁটতে ত্রিপুরা পল্লীতে চলে এলাম। হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলো ওরা। পাশের বাড়ির ছোট্ট বালক পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে গেলো আমাদের। দুই বাড়ি পর ঘরের দাওয়ায় পড়তে বসে গেছে স্কুল বালিকা, সাথে সাথেই মনে পড়ল এ এলাকায় বিদ্যূৎ নেই।


অনেক রাত পর্যন্ত অন্ধকারে বাংলোর সামনে খোলা জায়গায় বসে আড্ডা দিলাম। বাংলোর বাবুর্চি “সাথীর মা” একটু পর পর চা’য়ের যোগান দিতে থাকল। একসময় ঠাণ্ডায় যখন কাঁপতে থাকলাম তখন উঠে ঘুমাতে গেলাম।


পরদিন আবারো খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ক্ষুধার্ত বানরের দল খাবারের দখল নিতে ঝগড়া বাঁধিয়েছে। আস্তে আস্তে বাংলো থেকে নেমে সামনের রাস্তা পেরিয়ে বনের ভেতর ঢুকলাম। ছোট্ট পায়ে চলা পথ, এলোমেলো, উঁচু নিচু, দুপাশ থেকে জংলী গাছ এসে ছুঁয়ে দিয়ে যায়, ধরে রাখতে চায়, আমরা হাত দিয়ে সরিয়ে সামনের দিকে হাঁটি, মাথার উপর বড়ো গাছের ছাউনি, তার থেকে টিপ টিপ করে বৃষ্টির মতন শিশির ঝরে পড়ে। আমরা সারি বেঁধে সে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটি, সে পথ একসময় শুকনো পাহাড়ি নালা পেরোয়, আমরা নালাতে নেমে যাই। নিচে সাদা বালি, শুকনো, বৃষ্টি এলেই স্রোতের কারণে এপথে হেঁটে যাওয়া যাবে না। মাকড়সার জাল হাত দিয়ে সরিয়ে আমরা বালিতে হাঁটতে থাকি, দুপাশে খাড়া দেয়াল, কিনারে বাঁশ গাছ, পেছনে বন। এরই ফাঁক গলে সূর্য উঁকি দেয়া শুরু করেছে। আমরাও বুঝতে পারলাম ফেরার সময় হয়েছে।


Inside Satchori reserve forest

Matisse at Patrokhola tea garden

শনিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০০৯

ঈদ ছবির গল্প

যাত্রা পর্ব।

প্রথম ধ্বাক্কাটা খেলাম উত্তরার শেষ প্রান্তে মাস্কট প্লাজার মোড়টা পেরুতেই। পেছনে ডান দিকে ঘষা লাগিয়ে দিলো ময়মনসিংহ গামী বাস। মিররে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। এদিকে জ্যাম সবে মাত্র লাগতে শুরু করেছে। বন্ধের সময় সকাল আটে অত গাড়ী ঘোড়া রাস্তায় না থাকারই কথা। ভাবলাম টঙ্গী ব্রীজ পেরুলেই রাস্তা খালি, আরামে চলে যেতে পারবো। আমার ধারণা মিথ্যে প্রমানিত হলো কিছুক্ষণের ভেতরই।চারদিকে শুধু গাড়ী আর গাড়ী, ছোট বড় যাত্রীবাহী গাড়ীর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাক। সেই ট্রাকেরই আবার নানান কিসিম, কেউ মেঝেতে ত্রিপল বিছিয়েছে কেউবা তোষক। এরই মাঝে চারদিক থেকে ঝুলে ঝুলে মানুষ উঠছে। দূর্বল বিশেষ করে মহিলাদের টেনে টেনে তোলা হচ্ছে ট্রাকের উপর। উপরে উঠতে পারার বা বাড়িতে যেতে পারার সূরাহা হবার আনন্দ তাদের চোখে মুখে। টাংগাইল ছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহের সব জেলায় পৌঁছার প্রধান সড়ক এটাই। সেসব রুটের বাস ছাড়াও বাড়তি কামানোর ধান্ধায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটের বাসও চলছে আগাপাশতলা মানুষে বোঝাই হয়ে সে সব গন্তব্যে। কত মানুষ ঢাকা ছাড়ে ঈদে? গাড়ী চলছেনা। মাঝে মাঝে থেমে থাকতে হচ্ছে, এমনও হয়েছে প্রায় ঘন্টা খানিক চুপচাপ বসে আছি, এরপর একটু এগোয়, আবার থামে, আবার এগোয়। গাড়ীতে রেডিয়ো ছেড়ে রেখেছি, চার ঘন্টার এক এপিসোডে থেমে থেমে ক্যান্সারে আক্রান্ত কবি কাজী রোজীর সাক্ষাৎকার শুনলাম। ভদ্র মহিলা পনেরো বছরের উপর ক্যান্সারের সাথে লড়াই চালাচ্ছেন। গাড়ীতে আমি, রিতা আর মাতিস ছাড়াও আছে মাতিসের বন্ধু সাদ্‌। ওরা থাকে নিকেতনে আমাদের উপরের তলায়। সাদের বাবা পাকিস্তানী, বছর আটেক আগে করাচীতে ছুরীর আঘাতে মারা যান, সাদের তখন মাত্র জন্ম হয়েছে। ঘুমানোর আর স্কুলের সময়টুকু ছাড়া প্রায় পুরোটা সময় আমাদের বাসাতেই থাকে। ঢাকার ভেতর কোথাও বেড়াতে গেলে মাতিসের সাথে সাদ থাকবেই, এবারের ঈদে বাড়ী যাবার আগের দিন সাদ কে বলার সাথে সাথে রাজী, ওর মাকেও দেখলাম সানন্দে রাজী হতে, সাথে সাথে ওর ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন। সাদের জন্য ঢাকা ছাড়া এই প্রথম, চারদিকে প্রবল উৎসূক্য নিয়ে তাকিয়ে আছে। সবই অসাধারণ লাগছে ওর কাছে। বাস ট্রাকের উপর থেকে গলা বের করে বমি করা দেখতেও তাদের আনন্দ লাগে।ঠিক করেছিলাম তিন সাড়ে তিন ঘন্টা যাই সময় লাগুক বাড়ী পৌঁছেই নাস্তা করবো, গাড়িতে বিস্কিট আছে, ক্ষুধা লাগলে বাচ্চারা খেয়ে নেবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এসে বাড়ীতে ফোন করে জানানো হলো আমরা হয়তো দুপুরের খাবারের সময় এসে পৌঁছাবো। আমার সে ধারণাও সঠিক ছিলোনা, জয়দেবপুরের মোড় যখন পেরিয়েছি বেলা সেসময় দেড়টা, ৩২কিমি রাস্তা পেরুতে সাড়ে পাঁচ ঘন্টার উপর লেগেছে, কল্পনারও বাইরে। এর মাঝে গাড়ীতে ঘষা লেগেছে মোট পাঁচবার। শেষবার ঠিক জয়দেবপুর মোড়টা পেরুবার আগে আগেই। ঠিক করেছিলাম এযাত্রায় মেজাজগরম করবোনা। শেষ বারে তা আর ধরে রাখতে পারিনি।আমার জীবনে যতবার ঢাকা থেকে বাড়ী গিয়েছি তার মাঝে দীর্ঘতম সময় যাত্রার সাড়ে নয় ঘন্টা পর যখন বাড়ীর গেট পেরুলাম সূর্য ততক্ষণে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।ঢাকার তুলনায় ময়মনসিংহে ঠান্ডা বেশী,হঠাৎ করেই কনকনে বাতাস গায়ে লাগা শুরু হলো, আব্বা জ্যাকেট বের করে দিলেন উনার। প্রতিবারের মত আমরা আড্ডায় বসে গেলাম, বাড়ির বউরা রান্না বান্নায়, আগামীকাল ঈদ।

eid adda
এক।

ঢাকায় স্কুল ছুটি থাকলে মাতিস সাধারণত দেরী করেই বিছানা ছাড়ে, ঈদের দিন সকাল সাতটার আগে ওকে বিছানা ছাড়তে দেখে তাই অবাকই হলাম। আমাদের তিন ভাই দেশের বাইরে থাকায় ওরা ছাড়া বাকি পাঁচ জন পরিবার সহ বাড়িতে। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে সংখ্যাটা নিতান্ত কম নয়। সারা বছর খালি পড়ে থাকলেও ঈদের সময় বাড়ি গিজগিজ করে। এদিকে বাড়িতে গিজার লাগানো গোসলখানা একটাই, সাদ আর মাতিসকে গোসল দিয়ে যখন নাস্তা করাতে বসেছি ঘড়িতে আটটা বাজেনি সেসময়। নাস্তার পর ওদের নিয়ে গেলাম বাড়ীর পেছনে। সেখানে প্রথমেই পুকুর, শীত বলে পানি কম, বাঁশ ঝাড় আর সেগুন মেহগিনির বাগান। সে বাগানের পাশে ধানী জমি, তাতে পাকা ধান সোনালী হয়ে আছে। ধান ক্ষেত পেরুলেই বন। ওরা সবাই মেতে উঠলো খেলায়। একবার পুকুরের উঁচু পাড় বেয়ে উঠে আর একবার ধান ক্ষেতের ভেতর দৌড়ে বেড়ায়। সাদকে দেখলাম কিছু ধান ছিড়ে পকেটে ভরতে, ঢাকায় ফিরে মাকে দেখাবে।

Boys are taking breakfast on EID day
Walking through a paddy field
Kids are playing in wooded area
Group of boys on EID day
দুই।

ঠিক দশটায় ঈদ্‌গায়। শীতের দিন, কুয়াশা তখনও কাটেনি। এবারে জামাতে লোক সমাগম কম। কারনটা বুঝলামনা। আমাদের গ্রামে কোরবানীর নিয়মটা একটু অন্যরকম। সবাই যার যার কোরবানী নামাজের পর মাঠে নিয়ে আসে, সেখানেই কোরবানী দিয়ে ভাগের মাংস রেখে বাকিটা বাড়ি আনা হয়। এরপর সবার রেখে আসা মাংস একত্র করে গ্রামের সব পরিবারকে সমান ভাগ করে দেওয়া হয়। এছাড়াও বাড়িতে নিয়ে আসা মাংস থেকেও অনেকে গরীবদের দিয়ে থাকে। ব্যবস্থাটা একদিক থেকে ভালোই। এবারে গরু জবাইয়ের সময় আমি কাছাকাছি ছিলামনা, সময় কাটিয়েছি বাড়িতে, বাচ্চাদের সাথে।

Eid Embrace
Celebrating EID day
Eid Embrace
তিন।

দুপুরের আগে বাচ্চারা আবদার ধরলো ওরা শিকারে যাবে, কিভাবে যেন টের পেয়েছে বাড়িতে বন্দুক আছে। সেইমত বন্দুক হাতে দলবেঁধে পেছনের বাগানে। বন্দুকের ভার বইতে না পারলেও একেকজনের টার্গেট প্র্যাক্‌টিসের বিরাম নেই। সেনাবাহিনীতে থাকা আমার এক ছোট ভাই ওদের ইন্সট্রাক্টর, বাড়ির মেয়েরাও আবার বাদ যাবে কেন? ওরাও এসে জুটলো টার্গেট প্র্যাকটিসে। বাচ্চাদের সাথে মিশে আমরাও কিছুক্ষণের জন্য বয়সটা ভুলে গেলাম। ফিরে গেলাম শৈশবে। বাড়ির পেছন থেকে শুরু করে বন পর্যন্ত বেশ ক’বার দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত শরীরে বাড়িতে ফিরে খেতে বসলাম সবাই।

Kids are walking through a paddy field nearby Modhupur forest
Target Practise
Target Practise
চার।

দুপুরের পর একটু আলসেমী মত লাগলেও উঠে পড়লাম, পরদিনই ঢাকা ফিরবো, হাতে সময় কম, একবার বড়ই বাগানটা দেখে না এলে কেমন হয়। সখের বাগান। পাঁচ একরের বিশাল বাগানের গাছ গুলো দেখতে দেখতে বড় হয়ে গিয়েছে। এবারে ধরেছেও প্রচুর। পাতা আর ফল আলাদা করাই মুশকিল। মাস খানিক পর থেকেই খাবার উপযুক্ত হবে। গতবার ফলনের দাম পাওয়া যায়নি। খেয়াল করে দেখেছি যেকোন সব্জী বা ফল ঢাকায় যে দামে খুচরা বিক্রি হয় খামারে পাইকারী বিক্রি হয় তার তিন ভাগের একভাগ দামে, কোন কোন ক্ষেত্রে তারও কম। আমার পাশের বাগানের কাঁচামরিচ পাইকারী বিক্রি হতে দেখলাম প্রতি ৪০কেজি ৪৭৫টাকা দরে! বাগানে পৌঁছানো মাত্রই বাচ্চারা মেতে উঠলো খেলাতে।

Kids seating on a wooden watchtower inside a Lemon garden at Madhupur forest enjoying scenic beauty.
Kids are taking rest after a walk
Picking lemon from garden
পাঁচ।

সবশেষে আসুন আমাদের বাড়ির নুতন অতিথির সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, আশা করি আগামীবছর এই সময় তাকেও অন্যদের সাথে খেলায় মেতে উঠতে দেখা যাবে।


New to our family

তাৎক্ষণিক নভেম্বর ২৫, ২০০৯

১।

গতকাল হঠাৎ করে মাস্টার্সের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়লো। সার্টিফিকেটানুযায়ী আমার মাস্টার্স পাশের বছর ১৯৮৪, যদিও সামরিক শাসনের জন্য অনির্ধারিত বন্ধে আমরা চুড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছিলাম ‘৮৭তে। ২৫ বছর যাবৎ এই সার্টিফিকেট ছাড়াই জীবন পেরিয়ে এলেও এখন এটা খুঁজতে যেয়ে জান বেরোবার উপক্রম। মনে আছে ৮৯’র দিকে ইউনিভার্সিটি থেকে সার্টিফিকেট তুলেছিলাম এবং সে বছরই কোন এক এরশাদ ভ্যাকেশনে মহসিন হলে পুলিশি তান্ডবে রুমে রাখা আমার সার্টিফিকেট গুলো অন্যান্য জিনিষপত্রের সাথে হারিয়ে গিয়েছিলো পেয়েছিলাম শুধু একটা ফটোকপি। এতদিন পর প্রায় পাঁচ ঘন্টা তন্নতন্ন করে খুঁজে অনেক কাগজের মাঝে অবশেষে সেই ফটোকপি হাতে পেয়েছি। আজ আবার ইউনিভার্সিটি দৌড়াতে হবে এটার মূল কপি তুলতে।

২।

আমাদের বাসায় জিনিষপত্র এমনিতেই কম। তারপরেও খুঁজে পেতে দেরী হবার কারন ভিন্ন। মাঝে মাঝে বিশেষ কিছু জিনিষ যেমন কার্ড, বই, ছবি, ক্যাটালগ ইত্যাদি কিছুদিন পর দেখবো বলে জমিয়ে রাখতাম এবং যথারীতি ভুলেও যেতাম। গতকাল তেমন একটা বই হাতে পেয়ে অনেক্ষণ ধরে দেখলাম। ২০০২ সালের দিকে একটা ব্যাংকের অর্থানুকুল্যে ডঃ নওয়াজেশ আহ্‌মেদের তোলা ছবি আর রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রের লাইন নিয়ে ছবির বই বেরোয়েছিলো। মনে পড়ে সীমিত ছাপা (১০০০কপি) এই বইটি সেই ব্যাংকের সেরা গ্রাহকদের মাঝে বিনামূল্যে দেয়া হয়েছিলো। ২০০৫ এর দিকে একবার আমার ছোট ভায়ের অফিসে যেয়ে বইটি দেখে নিয়ে এসেছিলাম এবং যথারীতি ভুলেও গিয়েছিলাম। গতরাত প্রায় দুইটা পর্যন্ত বইয়ের ছবিগুলো দেখলাম। প্রায় ছবিই পদ্মার আশেপাশে তোলা। কিছুদিন আগে ডঃ আহ্‌মেদের সাথে আড্ডায় উনি আবারো পদ্মায় সময় কাটানোর কথা বলেছিলেন, জানিয়েছিলেন উনি ডিজিটাল ক্যামেরা কিনবেন যদি আমরা উনার সাথে পদ্মায় যাই। বলেছিলাম এটা আমাদের মত যে কারো জন্যে ভাগ্যের ব্যাপার হবে যদি উনার সাথে ছবি তোলা নিয়ে কিছুদিন কাটাতে পারি। বইটা দেখতে দেখতে ঠিক করলাম আজকেই উনার সাথে যোগাযোগ করবো এব্যাপারে। আমার দূর্ভাগ্য আমি জানতামনা যখন উনার তোলা ছবিগুলো দেখছি সেসময় উনি সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন।

20090207_2503
৩।

আমাদের বাসা থেকে আমার অফিস প্রায় নয় কিমি। এটুকু রাস্তার প্রথম দেড় কিমি পেরুতে আধ ঘন্টার উপর সময় লাগে, আজ লেগেছে পাক্কা ৪৫মিনিট। প্রতিবছর কোরবানীর ঈদে বাড়ি যাই, সাধারণত ঈদের আগের দিন, এবারেও হয়তো তার ব্যতীক্রম হবেনা, সব ঠিক থাকলে আগামী শুক্রবার ঢাকা ছাড়বো। ফিরে আসবো ঈদের পরদিন। ইদানীং ঢাকা ছাড়া খুব ঝামেলার। ১৬০কিমি দূরে বাড়ীতে যেতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টার অর্ধেক সময় লাগে ঢাকা ছাড়তে। ঈদের আগে এখনই ঢাকার যে অবস্থা তাতে পাঁচ ঘন্টায় যেতে পারলেও স্বস্তি।

Busy City
৪।

প্রতিবছরের মত এবারেও আমাদের অফিসের ক্যালেন্ডার ছাপাতে দিয়েছি, আগামী মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বিতরন শুরু করবো, গতবছর এসময় উত্তরায় এক মেগা সচলাড্ডায় বেশ কিছু ক্যালেন্ডার পাঠিয়েছিলাম বিতরনের জন্য, সেদিন সিলেট থেকে ফিরছিলাম, মনে আছে বিডিআর আর নজরুল ভাই বার বার ফোনে খোঁজ নিচ্ছিলেন কতদূর এসেছি, শেষ পর্যন্ত যদিও যাওয়া হয়নি সেখানে। আজ হঠাৎ মনে হলো এবারেও কী তেমন এক বিশাল সচলাড্ডার আয়োজন করা যায়না?

Calendar
৫।

এবারে একটু অন্যরকম খবর। গেটি ইমেজের নাম অনেকেই শুনেছেন। অনেকদিন যাবৎই ওরা আমার ছবি চাচ্ছিলো বিক্রি করার জন্য। গেটিতে ছবি দেয়ার নানা ঝামেলা, কপিরাইটের কারনে ওরা এমন এমন কাগজপত্র চায় তাতে মনে হয় সেখানে ছবি দেয়া হয়তো কোনদিন হবেনা। এরমাঝে একটামাত্র পাঠিয়েছিলাম, সেদিন দেখি ওরা চেক পাঠিয়ে দিয়েছে ডাকে। সেই চেক আমাদের দেশের অনেক নিয়ম কানুনের বেড়াজালে পড়ে এখনও জমা দেয়া হয়নি। আদৌ হবে কীনা সেটাও বলতে পারিনা। ছবিটা দেখুন, তিওমানে বেড়াতে যেয়ে G9 ক্যামেরায় তোলা।


Salang beach, Tioman Island