ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, জুন ০৬, ২০১০

পেনাং পেনাং ...

এর আগে জানিয়েছিলাম পাঁচ ঘন্টা ড্রাইভের পর অবশেষে পেনাং পৌঁছেছি। অরূপের গাড়িতে আমি, রিতা, মাতিস, অভিক আর অরূপ নিজে। পেনাং এ ঢুকে প্রথমেই যা করেছি তা হলো পরদিন স্নোরক্লিং এর টিকিট কনফার্ম করা। সেটা হয়ে গেলে রাজ্যের আলস্য আমাদের জড়িয়ে ধরে। আমি দেশে একটানা ১০ ঘন্টার উপর ড্রাইভ করলেও ক্লান্ত হইনি কখনও, কিন্তু এখানে পেছনে বসে থাকার অনভ্যস্ততায় অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিলো। গতবার তিওমেন যাবার সময় অনেকখানি রাস্তা আমার হাতে স্টিয়ারিং তুলে দিলেও এবারে অরূপ মহানন্দে গাড়ি চালাচ্ছিলো, আমিও কিছু বলি নি।

যাই হোক আসুন আবারো মূল গল্পে ফিরে যাই।


বালি হাই

Streets of Georgetown সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আকাশও মেঘলা, কয়েকটা গাড়ি ইতোমধ্যেই হেড লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঠিক করলাম কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ডিনার সেরেই হোটেলে উঠব। গাড়ি চললো গার্নি ড্রাইভের দিকে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন বৃটিশ রাষ্ট্রদুত স্যার হেনরী গার্নিকে মালয় কম্যুউনিস্ট গেরিলারা এ রাস্তায় গুলি করে মেরেছিল। গুলির সময় সাথে থাকা স্ত্রী আর ড্রাইভারের জীবন বাঁচাতে উনি রোলস রয়েস থেকে নেমে যান এবং নিহত হন। মালয় কম্যুউনিস্ট পার্টির নেতা চিন পেং পরবর্তিতে জানিয়েছেন সেটা ছিলো একটা নিয়মিত টহলের ঘটনা এবং কয়েকদিন পর পত্রিকার খবরে তারা নিহতের পরিচয় জানতে পারেন।

20100417_9999_5 অরূপ এর আগেও এদিকে এসেছে, সুতরাং রাস্তা খুঁজে পেতে সমস্যা হলো না। এ ফাঁকে চুপিচুপি একটা কথা জানিয়ে রাখি, আমাদের সচল মাশীদের জন্ম কিন্তু এই পেনাং-এ। জর্জটাউনে সাগরের পাড় ঘেঁষে চমৎকার রাস্তা গার্নি ড্রাইভ, একপাশে নিচু রেলিং এর ওপারে সমুদ্র অন্যপাশে বেশিরভাগই খাবারের দোকান, স্টেশনারি শপ, প্রচুর টুরিস্ট হেঁটে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের পার ধরে, সময়টা ভাটার, রেলিং থেকে কিছুটা দূরে শান্ত সমুদ্র আস্তে আস্তে আরো দূরে নেমে যাচ্ছে, দুয়েকটা সামুদ্রিক পাখি ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে তাতে। এপারের নিয়ন সাইনগুলো আস্তে আস্তে আলো ছড়াতে শুরু করলে আমরা এসে পৌঁছালাম চমৎকার রেস্টুরেন্ট “বালি হাই”এ। ঢোকার দরজায় বড় বড় লেখা “If it swims we have it”।

প্রায় ৫০০ জনের বসার ব্যবস্থা রাখা বিশাল এই রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না তেমন কোনো সামুদ্রিক প্রাণী নেই। আর আশ্চর্য যে সবই জীবন্ত! একপাশে বিশাল বিশাল ট্যাঙ্কে ভেসে বেড়াচ্ছে ৫/৬ কেজি ওজনের অস্ট্রেলিয়ান লবস্টার থেকে শুরু করে নানান জাতের মাছ আর কাঁকড়া, কাঁকড়ারও আছে প্রকারভেদ, আলাস্কান স্পাইডার থেকে শুরু করে ৮ কেজি ওজনের রাজ কাঁকড়াও দেখলাম। আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেই কিছুক্ষণ পরই খাবার টেবিলে চলে আসবে, চাইলে পাশে কাচ দিয়ে ঘেরা রান্নাঘরের ভেতরে রান্নাটাও দেখে নেয়া যায়।

আমরা বসেছিলাম মূল শেডের বাইরে রাস্তার দিকে ছোট ঝুপরির নিচে, এদিকটা খোলা, তাকালেই সমুদ্র, একটু পর আমাদের দৃষ্টি আটকে দিয়ে গাড়ি পার্ক করা শুরু হলো, খাওয়ায় মন দিলাম আমরা।

চমৎকার স্বাদের এক টেবিল ভরা খাবার শেষ করে আমাদের আর উঠতে ইচ্ছা করছিলো না, এমন সময় শুরু হলো আকাশ কাঁপিয়ে ঝড়বৃষ্টি। আমরাও আড্ডা আর বিশ্রামের সময় পেলাম। ঘন্টা খানিক পর বৃষ্টি ধরে এলে উঠলাম, তখনও হোটেল ঠিক করা হয় নি আমাদের।


বাটু ফিরিঙ্গি

Penang street souvenir shop মালয়েশিয়ান ভাষায় বাটু মানে পাথর, সে অর্থে জায়গাটার নাম ফিরিঙ্গিদের পাথর। পেনাং এর উত্তর-পুবে বাটু ফিরিঙ্গি এর সুন্দর বিচ আর রাতে বসা হকার মার্কেটের জন্য বিখ্যাত। অনেকগুলো সুন্দর হোটেল পাহাড়ের কোল বেয়ে প্রায় বিচের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। জর্জটাউন থেকে বেশ আঁকাবাঁকা আর উঁচুনিচু রাস্তা ধরে এদিকে আসতে হয়। রাতে থাকার জন্য আমরা বেছে নিয়েছিলাম এখানকারই ডি'ফিরিঙ্গি হোটেল। পরদিন ভোরে আমাদের তুলে নেবার জায়গা এখানথেকে হাঁটা পথে পাঁচ মিনিট।

পরদিন ভোর ছয়টায় বাস ধরতে হবে, ডেকে তোলার দায়িত্ব আমি নিয়ে যার যার রুমে। চাবি ঘুরিয়ে ঢুকতেই অভ্যর্থনা জানালো বিশালাকায় ইঁদুর।


পুলাও পায়ার

IMG_7288 ভোরে সঠিক সময়ে উঠার বাড়তি সতর্কতা হিসাবে হোটেল ম্যানেজারকে বলে রাখলেও ভোরে ঠিক সময়মতো উঠতে পেরেছিলাম সবাই। ডাকতে এসে যদি ফিরে যাই সেজন্য দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়েছে অভিকরা। হাতমুখ ধুয়ে বাসের অপেক্ষায় হলিডে ইনের লবিতে পাঁচ মিনিট আগেই আসতে পেরেছি। বাসও এলো সময়মতো, আমরাও উঠে বসলাম, গাইড এসে সবার হাতে প্লাস্টিকের ব্যান্ড পরিয়ে দিয়ে গেল, পরবর্তী কয়েক ঘন্টা এটাই আমাদের টিকিট।

20100419_9999_166 ভোরে রাস্তায় তেমন ভিড় নেই, রাস্তায় মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ২/১ জন কে তুলে নিয়ে জেটিতে এসে দেখলাম আমাদের মতন জনা পঞ্চাশেক দাঁড়িয়ে আছে ফেরির অপেক্ষায়। পেনাং থেকে পায়ার ফেরিতে দুঘন্টা উত্তরে, লাংকাউই থেকে দক্ষিণে এক ঘন্টা। প্রতিদিন এ দু দ্বীপ থেকে ১০০ জনের অনুমতি মেলে পায়ারে যেতে। স্নোরক্লিং কিংবা স্কুবা এগুলোই থাকে উদ্দেশ্য। মালয়েশিয়ার অন্য সব স্নোরক্লিং সাইটের চাইতে এখানকার খরচ অনেক বেশি।

দু ঘন্টা পর তীর থেকে আধ কিমি দূরে পায়ার এর ভাসমান জেটিতে নেমে চারদিক একবার দেখে নিলাম। পানির নিচে কোরালের উপর ভাসমান ৪৯ বাই ১৫ মিটারের জেটি, তার উপর বসার জন্য গোল করে সাজানো টেবিল চেয়ার, কয়েকটি টয়লেট আর বাথরুম, একপাশে খাবার জায়গা আর স্যুভেনির শপ। চারদিকে নীল পানি, এর মাঝে কিছু জায়গা ঘেরাও দেয়া টুরিস্টদের জন্য, তার বাইরে সাঁতার কাটা নিষেধ। নিচে পানিতে তাকালে হরেক রকমের মাছ আর কোরাল চোখে পড়ে।

IMG_7286 টেবিলের উপর মাস্ক, একপাশে ফ্লিপার আর লাইফ জ্যাকেট। এক এক করে পড়তে পড়তে গাইডের বক্তব্যও শুনে নিলাম। সিঁড়ি বেয়ে পানিতে নামার সময় নিচে তাকালে কয়েক মিটার নিচের মাটি পরিষ্কার দেখা যায়, কোরালের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ভেসে বেড়াচ্ছে নানান প্রজাতির মাছ, খুব কাছে এসে গা ছুঁয়ে যায়, আবার ধরতে গেলে পালিয়ে যায়। পানির নিচে আলোছায়ার অদ্ভুত খেলা। উপরে কড়া রোদ। মাস্ক ঠিক থাকলে একটানা নিচে তাকিয়ে ভেসে থাকা সম্ভব। এখানকার সরবরাহ করা মাস্কগুলো অতি ব্যবহারে নতুনত্ব হারিয়েছে। মাঝে মাঝেই নোনা পানি ঢুকে যায়, নিঃশ্বাসের গরমের সাথে নোনা পানিতে চোখ জ্বলে।

IMG_7316 মাতিসের সাইজের মাস্ক মেলে নি, যেটা পড়েছে তাতে একটু পরপরই পানি ঢোকে, ফ্লিপারটাও সাইজে একটু বড়, তাতেও তার উৎসাহের কমতি নেই, সাঁতার কেটেই আনন্দ করছে। রিতার অবস্থাও তথৈবচ। সে আবার সাঁতার জানে না। মাতিস মাঝে মাঝেই ওর মাকে উৎসাহ দিচ্ছে, ‘মা মা এভাবে করো’।

IMG_7308 আমি নেমেছিলাম ক্যামেরা হাতে, একটু পর সেটা তুলে দিলাম অভিকের কাছে। এখানকার কোরাল সুন্দর, মাছ আর সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যাও বেশি। জেটির নিচে কাচ দিয়ে ঘেরাও দেয়া কেবিন আছে, তাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও নিচের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।

দুপুরের খাবার ব্যবস্থা জেটিতেই, বুফে। অনেকক্ষণ সাঁতার কেটে ক্ষুধা ভালোই পেয়েছে। পেটে ক্ষুধা নিয়ে খাবারের মান বিচার করি নি। খাওয়ার পর সবাই শার্ক দেখতে গেলেও আমি আবার পানিতে নেমেছিলাম।

Mahamariamman Temple বিকেলে ফিরতি যাত্রা, লানকাউই থেকে ফেরি এলে এক এক করে উঠে পড়লাম, মাঝখানে একটু ঝিমুনি এলেও উঠে বাইরের ডেকে চলে এসেছি। চারদিকে পানির উপর জেগে থাকা দু একটা পাহাড়ের মাথা আর দূরে পেনাং এর হাইরাইজগুলো আবছা আবছা দেখা যায়, ফেরির গতি ভালোই, ডেকের রোদ গায়ে অসহনীয় উঠার আগেই ফেরি জেটিতে চলে এলো। সেখান থেকে শেষ বিকালে হোটেল পৌঁছালাম। কথা ছিলো সেদিনই কুয়ালালামপুর ফিরবো। কিন্তু দেখা গেল সবাই আরেকদিন থাকব বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।


বিচ আর হকার মার্কেট

20100418_9999_12 হোটেলের ঠিক উলটো দিকে রাস্তার পাশে বিশাল খোলা পার্কিং লট, সেখান থেকে পায়ে চলা পথ নেমে গেছে বিচের দিকে। পার্কিং লটের ঢোকার মুখে পাশের পাকা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একচালা স্যুভেনির শপ। হরেক রকমের জিনিস, কিছু সেখানকার নিজস্ব তৈরি হলেও বেশির ভাগই ভিয়েতনাম থেকে আনানো। হোটেল থেকে বের হয়ে অরূপ আর অভিক নিচে বিচে চলে গেলে আমরা মার্কেটে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। বড় একটা কাঠের প্লেটে জর্জটাউনের রাস্তা আঁকা, তাতে আবার সাদা ঝিনুক বসানো, দেখেই পছন্দ হলো, আবার ঝিনুক বসানো কাঠের টিস্যু বক্স। দামাদামি করতে যেয়ে দেখলাম দোকানদার বাঙালি। কেনাকাটা সবে মাত্র শুরু হয়েছে তেমন সময় নিচ থেকে ফোন, মামা তাড়াতাড়ি আসেন, গোলাপি সানসেট, আমরা দৌঁড়ালাম।

20100418_9999_5 বিচ সুন্দর, এরইমাঝে জেটস্কির ভমভম আওয়াজ দৃষ্টি সেদিকে টানে। তাকিয়ে দেখি ওর পেছনে দড়িতে বেলুন বেঁধে উড়ছে কয়েকজন। আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে দেখে মাতিস আর রিতা কোমরে দড়ি বেঁধেও উঠতে পারল না। একটা বাঙালি ছেলে ঘোড়া ছুটিয়ে মাতিসকে নিয়ে গেল। আমার ক্যামেরা ব্যস্ত হয়ে উঠার আগেই শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। পেনাং এর বৃষ্টি, কখন আসে কখন যায় কোনোই ঠিক নাই। ছুটলাম সবাই পারের দিকে। ঘোড়ার সহিস ছেলেটা মাতিসকে নিরাপদে পারে পৌঁছে দিয়ে গেছে।


ভারতীয় খাবার, রাতের পেনাং, আর ম্যান ফর ম্যান, লেডিস ফর লেডিস

20100417_9999_18 বৃষ্টি থামতে থামতে রাত নেমে এসেছে পেনাং-এ। রাস্তাঘাট ভেজা, এরই মাঝে লোক চলাচল শুরু হয়েছে আবারো, তিন চাকার রিকশাও দেখলাম কয়েকটা। আশে পাশের দোকানগুলো ঝাঁপ খুলে তৈরী। ঠিক করলাম রাতের খাবার খেয়েই মার্কেটে ঢুকব। কোথাও বেড়াতে গেলে স্থানীয় খাবারের প্রতি একটা পক্ষপাতিত্ব থাকলেও কাছাকাছি ভারতীয় খাবারের দোকান দেখে ঢুকে পড়লাম। নামেই শুধু ভারতীয়, মান আর স্বাদ কিংবা দামের তুলনায় পরিমাণ কোনটাই আমার পছন্দ হয়নি।

Penang street souvenir shop এবারে ঘোরাঘুরি, টিপটিপ বৃষ্টি, নানান জাতের আর পদের শোপিস, ঘড়ি, ঘর সাজানোর সাজসরঞ্জাম, চুলের ফিতা, হারবাল ক্রিম, বাঘ আর বানরের তেল, ট্রাভেল ব্যাগ, জুতা কিংবা স্যান্ডেল, আইসক্রিম, ক্রোকারিজ, টিশার্ট, স্কার্ট, বাটিকের কাপড়, কাঠের কাজ করা লাইট শেড, বই, সিডি, ছোট খাটো বৈদ্যুতিক সামগ্রী কোনো কিছুরই অভাব নেই এই মার্কেটে। এরই মাঝে ব্যাগের ওজন বাড়তে থাকল, সাথে চললো ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক।

20100418_9999_80 আমরা ঘুরছি এক দোকান থেকে অন্য দোকানে। এক পাশে কাগজ-পেন্সিল নিয়ে চিত্রকরের দল বসে গেছে, তাদের সামনে এক তামিল পরিবার মূর্তির মতন বসে আছে। আস্তে আস্তে কাগজে ফুটে উঠছে তাদের চেহারা। পাশেই সিংহলি মালিকাধীন স্যুভেনিরের দোকান তার আলোকসজ্জার গুণেই ভেতরে টেনে নিলো আমাদের। চমৎকার সুন্দর সব জিনিস, দামও তেমন চড়া। অনুমতি নিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। দোকান বন্ধ হবার সময়ও ত্রিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে, অগত্যা আমরা বের হলাম হোটেলে ফিরব বলে। গল্প করতে করতে ফিরছি সবাই, হোটেলের গেটের কাছে আসতেই পাশ থেকে স্থানীয় একজন নিচু গলায় বললো কাম ইন স্যার, ম্যান ফর ম্যান, লেডিস ফর লেডিস।

20100418_9999_64 বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগলেও বুঝলাম ভদ্রলোক পাশের পা টেপা দোকানের। ব্যাংকক, বেইজিং এর মতন মালয়েশিয়ার টুরিস্ট স্পট গুলোতেও পা টেপা দোকানের অভাব নেই। কুয়ালালামপুরের দোকানগুলোর সামনে বড় বড় পোস্টার টানিয়ে পা টেপার বৈজ্ঞানিক দিক ব্যাখ্যা করে ক্রেতা আকর্ষণ করা হয়। আমরা পা টেপাটেপিতে না যেয়ে রঙ্গীন আলো গায়ে মেখে ঘুরতে ঘুরতে হোটেলে ঢুকে গেলাম।


প্রজাপতি আর লাভ লেন

বুকিং এর সময় দেখেছিলাম এ হোটেলের চেক আউট সময় সকাল দশটা, তাই তখনই বলে রেখেছিলাম আমরা বিকেল ৩টায় হোটেল ছাড়বো, এসময় টুরিস্ট কম বলে রাজি হয়েছিলো তখন। সকালে নাস্তা করে আমরা তাই চলে গেলাম প্রজাপতির বাগান দেখতে।

Butterflies from Penang প্রজাপতির বাগান এরা বলে তামান রামা-রামা।আমরা যে রাস্তায় বাটু ফিরিঙ্গি এসেছি সে পথ ধরে আরো ১০ কিমির মতন সামনে এই পার্ক। প্রায় আড়াই একরের এ বাগানে ওদের কথানুযায়ী ১২০ প্রজাতির ৪০০ ধরনের প্রজাপতির সংগ্রহ আছে।

Butterflies from Penang পার্কে ঢোকার মুখেই বানানো পাহাড়ে বসে থাকা বিশাল তিনশিঙা বিটল আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকেই প্রজাপতির ছোঁয়া পেলাম। নানান রঙ, আকৃতি আর ধরনের অগুনতি প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে, প্রত্যেকটাই আলাদা আলাদা সুন্দর। উড়ে এসে গায়ে বসে আবার চলে যায়। কিছু কিছু প্রজাপতি খুব শান্ত হয়ে বসলেও কয়েকটাকে একবারের জন্যও ক্যামেরার ফ্রেমে আনতে পারি নি ওদের ব্যস্ততার জন্য। ছোট্ট এ বাগানের বাড়তি আকর্ষণ এর ভেতরের মিনি জু আর পোকা মাকড়ের জাদুঘর। এছাড়াও স্যুভেনির শপ আর একটা আর্ট গ্যালারিও আছে। জু তে বিটল, শিংওয়ালা কচ্ছপ, স্করপিয়ন আর ড্রাগন দেখলাম। জাদুঘরটা আরো চমৎকার, বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা নানান জাতের পোকামাকড় আর সরীসৃপ বয়ামে রাখা। দু’ঘন্টার চমৎকার সময় কাটিয়ে বাটু ফিরিঙ্গিতে বেলা বারোটার আগেই ফিরে এলাম। রিতা আর মাতিসকে হোটেলে রেখে আমরা তিনজন চলে এলাম জর্জটাউনে।

20100419_9999_153 জর্জটাউনের আধুনিক ইতিহাস সিঙ্গাপুরের চাইতে পুরোনো। জর্জটাউনের জন্ম ১৭৮৬ সালে আর সিঙ্গাপুরে বৃটিশরা আসে ১৮১৯ সালে। তারও কিছুকাল পর বৃটিশরা এ দুটো অঞ্চলকে সিটি হিসাবে ঘোষণা করে। বৃটিশদের দখলে যাবার আগে এ দুটোই যথাক্রমে কেদারের সুলতান আর জোহরের সুলতানদের দখলে ছিলো। বৃটিশদের কাছে সে সময় সিঙ্গাপুরের চাইতে জর্জটাউনের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং এর পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানান মেরুকরণে জর্জটাউন সিঙ্গাপুরের কাছে তার অবস্থান হারায় এবং ২০০৮ সালে এর পুরোনো অঞ্চলগুলো ইউনেস্কো হেরিটেজ হিসাবে ঘোষিত হয়।

20100419_9999_131 স্থানীয় মুসলমান, ভারতীয় তামিল আর চাইনিজ বংশোদ্ভূতদের নিয়ে জর্জটাউন। হাতে সময় কম বলে স্বল্প সময়ে শুধুমাত্র দু একটা রাস্তা ঘুরে দেখা ছাড়া আর কিছুই হলো না। ছবি তোলার জন্য জর্জটাউনে কমপক্ষে দিন দুই থাকা উচিত।

এবারে ফেরার পালা

20100419_9999_2 বিকেল ৩টায় হোটেল ছেড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরতি যাত্রায় কুয়ালালামপুরে। এবারে রাস্তায় ভালোই বৃষ্টি পেয়েছিলাম। মাতিসের টুইন টাওয়ার দেখার শখ মিটিয়েছে অরূপ ওর বাসায় ফেরার পথে টুইন টাওয়ার ঘুরিয়ে এনে। রাতে গোছগাছ সেরে খুব ভোরে যখন অরূপ মাশীদের বাসা ছাড়লাম মাতিস তখন তার সেই চেনা ডায়লগ ছাড়লো “বাবা, আমরা কী আবার এখানে আসবো?” উত্তর দিতে পারি নি, আসলে এ উত্তর আমার জানা নেই।

মঙ্গলবার, মার্চ ২৩, ২০১০

চর আলেকজান্ডার

ভোর চারটা। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। মনে হচ্ছে এখনও দৌড়ের উপর, গাড়ি চালাচ্ছি, একবার ডানে আরেকবার বামে ঘুরছি আমি। বালিশে মাথা রেখে মনে হলো বিছানা দুলছে। উঠে যেয়ে এসি ছেড়ে দিলাম, একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেলো ঘরটা জুড়ে। উলটো দিক থেকে গুনতে শুরু করলাম এবার একশো, নিরানব্বই, আটানব্বই, সাতানব্বই...
বেলা এগারোটা। চর আলেকজান্ডার। একটু আগে ঘুম থেকে উঠে নাস্তার টেবিলে, সবার নাস্তা সারা হয়ে গেছে এরই মাঝে। মাতিস দৌড়াচ্ছে এ ঘর থেকে সে ঘরে, আবার দৌঁড়ে বাইরে গেলো, আমার নাস্তা প্রায় শেষ এমন সময় কাছে এসে বললো “বাবা শব্দটা কীসের?” আমি বললাম ঝিঁ ঝিঁ পোকা।
মফস্বল শহরের পাকা বাড়ি, যখন বানানো হয় নদী ছিল পনেরো কিলোমিটার দূরে। এখন এক কিলোমিটারও হবে না, তাই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একতলা বাড়ি উপরে বাড়েনি। বিশাল এলাকা নিয়ে বাংলো মতন বাড়িটার সামনে পেছনে দুটো পুকুর, বৃষ্টি নাই বলে নিচের মাটি দেখা যায়। আর আছে গাছ, আম, জাম্বুরা, কাঠ বাদাম, কামরাঙ্গা, সুপারি, নারকেল কত জাতেরই না গাছ দেখলাম সেখানে। শাঁসওয়ালা ডাবের পানি হাতে মাতিসের সাথে বাইরে এলাম, সামনে পেছনে, উপরে নিচে একটানা ডেকে গেলেও একটা ঝিঁ ঝিঁ পোকারও সন্ধান করতে পারলাম না।
‘৭০ এর ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের এ এলাকার উপর দিয়ে তাণ্ডব বয়ে গিয়েছিল। আমি তখন ছোট। থাকতাম ময়মনসিংহে। মনে আছে সকাল থেকেই চারদিক ছিল সন্ধ্যা সন্ধ্যা, ঘন নীল আকাশ আস্তে আস্তে নেমে আসছিল নিচের দিকে, সেই নীলাকাশ কালো হবার আগেই স্কুল ছুটি হয়ে গেলে বাসায় ফিরতে ফিরতে চারদিক অন্ধকার। পরবর্তী কয়েকদিন বড়োভাই পত্রিকা কেটে কেটে ঝড়ের ছবি জমিয়েছে, ইত্তেফাক, আজাদ এসব পত্রিকার পাতায় পাতায় বীভৎস সেসব ছবি, পাতাহীন বিশাল বৃক্ষের চূড়ায় পতাকার মতো আটকে আছে টিনের চাল কিংবা দুলছে মানুষের লাশ। চর আলেকজান্ডারের নাম তখনই শোনা। ইচ্ছা ছিল গৃহকর্তার থেকে সেদিনের বিবরণ শুনব, বয়সের ভারে চোখ আর কান দুটোতেই উনার সমস্যা থাকায় সে সুযোগ হলো না। বাড়ির বড়ো ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হান্নান ভাই সুইডেন প্রবাসী, জুনে ফেরার কথা, ইচ্ছাটা তখনকার জন্য তুলে রেখে বর্তমানে ফিরে এলাম।
কানাডা প্রবাসী মাতিসের বড়োমামীদের পৈত্রিক নিবাস এখানে। মার্চের ১৮ তারিখ বৃহস্পতিবার অফিস করে কাপড় না বদলেই রওয়ানা দিয়েছিলাম। তখন বিকেল ছয়টা, ধারণা পেয়েছিলাম রাত বারোটার আগেই পৌঁছে যেতে পারি আলেকজান্ডার। কিন্তু রাত আটটা বেজে গেলেও যখন কাচপুর সেতু পেরুতে পারলাম না বুঝলাম দুঃখ আছে কপালে। কাচপুর পেরিয়ে কুমিল্লা, সেখান থেকে লাকসাম, সোনাইমুড়ি, বেগমগঞ্জ হয়ে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত চলে এলাম মোটামুটি শান্তভাবেই। সামনের সিট এলিয়ে মাতিস নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। পেছনে রিতা আর মাতিসের নানা। টুকটাক কথাবার্তা হচ্ছে আমাদের মাঝে, সমস্তই আমি যেন গাড়ি চালাতে যেয়ে ঘুমিয়ে না পড়ি সেজন্য। লক্ষ্মীপুর এসে শুনলাম আরো চুয়াল্লিশ কিলোমিটার যেতে হবে। এই সেই চুয়াল্লিশ কিলোমিটার, মনে হলো এবড়ো খেবড়ো উঁচু নিচু মাটির রাস্তায় খুব জোরে চালানো গরুর গাড়িতে বসে আছি। প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে ঝাঁকি খেতে খেতে রাত তিনটা নাগাদ সে রাস্তাও পেরিয়ে সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে আমি তখন ভাবছি কয়েকঘন্টা পরই আবার এ রাস্তাতেই আমাকে ফিরে যেতে হবে।
শুক্রবারের দুপুর, চারদিক প্রচণ্ড গরমের মাঝে বের হলাম মেঘনার মোহনা দেখব বলে। বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেখানে সরকারি রাস্তা এসে মেঘনায় ক্রমাগত বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম এর বিশালত্ব। আমার সামনে তিনদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু পানি আর পানি, সামনের নীল পানি দৃষ্টি সীমার ওপারে ধূসর হতে হতে মিশে গেছে আকাশের সাথে। কড়া রোদে আকাশে মেঘ নেই, বর্ণ নেই। নদী আর আকাশের সীমানা তাই আলাদা করা যায় না। পায়ের নিচে ঢেউ এসে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে মাটি সরিয়ে নিয়ে যায়। সে মাটির রং কালো, মাটি উর্বর। এখানে পানির গভীরতা সর্বোচ্চ দুই হাজার ফুটের কাছাকাছি।
আমরা সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। কত দেশ কত জনপদ পাড়ি দিয়ে, কতজনের দুঃখ আর ভালোবাসা বুকে নিয়ে মেঘনা এসে মিশে যাচ্ছে সাগরে। গঙ্গা, যমুনা আর ব্রহ্মপুত্রের প্রায় সব পানি যে ধারণ করতে পারে তার বিশালত্ব কীভাবে কল্পনা করি আমি? বিশ্বের সবচাইতে চওড়া নদীগুলোর একটি এই মেঘনা এখানে প্রায় ১৫কিলোমিটারের মতন চওড়া ভাবতেও কেমন যেন লাগে।
আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান, দুটো বেঞ্চ আর একটা টুল। মাতিস সেই কখন থেকে টুলে বসে আছে, রোদে পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু উঠার নাম নেই, তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, সেদিকে একটার পর একটা ঢেউ লাখ লাখ গ্যালন পানি নিয়ে ফেলছে সমুদ্রে, ঢেউ এর মাথায় মাঝে মাঝেই ভেসে উঠছে শুশুক। সে বসে আছে, আমিও যেয়ে বসলাম ওর পাশে। আস্তে করে মাতিস আমাকে বললো “বাবা, আমরা আর কোনোদিন কি এখানে আসব?’
আমাদের ফিরতে হয়, ফিরতে হয় কিছু মন্ত্রমুগ্ধ সুন্দর সময়ের স্মৃতি নিয়ে, যেই স্মৃতি একসময় গল্প হয়ে ভেসে বেড়াবে প্রজন্মান্তরে। তবে ফেরাটা অসহনীয় ছিল না মোটেই। মেঘনার মোহনা দর্শন সাথে আলেকজান্ডারের মহিষের দুধের দই আর ইলিশের স্বাদ ফেরার পুরোটা পথ যেভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তাতে ঢাকায় ফিরেও মনে হচ্ছিল আবারো যাওয়া যেতে পারে সেখানে।



20100319_9623

শনিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০০৯

ঈদ ছবির গল্প

যাত্রা পর্ব।

প্রথম ধ্বাক্কাটা খেলাম উত্তরার শেষ প্রান্তে মাস্কট প্লাজার মোড়টা পেরুতেই। পেছনে ডান দিকে ঘষা লাগিয়ে দিলো ময়মনসিংহ গামী বাস। মিররে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। এদিকে জ্যাম সবে মাত্র লাগতে শুরু করেছে। বন্ধের সময় সকাল আটে অত গাড়ী ঘোড়া রাস্তায় না থাকারই কথা। ভাবলাম টঙ্গী ব্রীজ পেরুলেই রাস্তা খালি, আরামে চলে যেতে পারবো। আমার ধারণা মিথ্যে প্রমানিত হলো কিছুক্ষণের ভেতরই।চারদিকে শুধু গাড়ী আর গাড়ী, ছোট বড় যাত্রীবাহী গাড়ীর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাক। সেই ট্রাকেরই আবার নানান কিসিম, কেউ মেঝেতে ত্রিপল বিছিয়েছে কেউবা তোষক। এরই মাঝে চারদিক থেকে ঝুলে ঝুলে মানুষ উঠছে। দূর্বল বিশেষ করে মহিলাদের টেনে টেনে তোলা হচ্ছে ট্রাকের উপর। উপরে উঠতে পারার বা বাড়িতে যেতে পারার সূরাহা হবার আনন্দ তাদের চোখে মুখে। টাংগাইল ছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহের সব জেলায় পৌঁছার প্রধান সড়ক এটাই। সেসব রুটের বাস ছাড়াও বাড়তি কামানোর ধান্ধায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটের বাসও চলছে আগাপাশতলা মানুষে বোঝাই হয়ে সে সব গন্তব্যে। কত মানুষ ঢাকা ছাড়ে ঈদে? গাড়ী চলছেনা। মাঝে মাঝে থেমে থাকতে হচ্ছে, এমনও হয়েছে প্রায় ঘন্টা খানিক চুপচাপ বসে আছি, এরপর একটু এগোয়, আবার থামে, আবার এগোয়। গাড়ীতে রেডিয়ো ছেড়ে রেখেছি, চার ঘন্টার এক এপিসোডে থেমে থেমে ক্যান্সারে আক্রান্ত কবি কাজী রোজীর সাক্ষাৎকার শুনলাম। ভদ্র মহিলা পনেরো বছরের উপর ক্যান্সারের সাথে লড়াই চালাচ্ছেন। গাড়ীতে আমি, রিতা আর মাতিস ছাড়াও আছে মাতিসের বন্ধু সাদ্‌। ওরা থাকে নিকেতনে আমাদের উপরের তলায়। সাদের বাবা পাকিস্তানী, বছর আটেক আগে করাচীতে ছুরীর আঘাতে মারা যান, সাদের তখন মাত্র জন্ম হয়েছে। ঘুমানোর আর স্কুলের সময়টুকু ছাড়া প্রায় পুরোটা সময় আমাদের বাসাতেই থাকে। ঢাকার ভেতর কোথাও বেড়াতে গেলে মাতিসের সাথে সাদ থাকবেই, এবারের ঈদে বাড়ী যাবার আগের দিন সাদ কে বলার সাথে সাথে রাজী, ওর মাকেও দেখলাম সানন্দে রাজী হতে, সাথে সাথে ওর ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন। সাদের জন্য ঢাকা ছাড়া এই প্রথম, চারদিকে প্রবল উৎসূক্য নিয়ে তাকিয়ে আছে। সবই অসাধারণ লাগছে ওর কাছে। বাস ট্রাকের উপর থেকে গলা বের করে বমি করা দেখতেও তাদের আনন্দ লাগে।ঠিক করেছিলাম তিন সাড়ে তিন ঘন্টা যাই সময় লাগুক বাড়ী পৌঁছেই নাস্তা করবো, গাড়িতে বিস্কিট আছে, ক্ষুধা লাগলে বাচ্চারা খেয়ে নেবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এসে বাড়ীতে ফোন করে জানানো হলো আমরা হয়তো দুপুরের খাবারের সময় এসে পৌঁছাবো। আমার সে ধারণাও সঠিক ছিলোনা, জয়দেবপুরের মোড় যখন পেরিয়েছি বেলা সেসময় দেড়টা, ৩২কিমি রাস্তা পেরুতে সাড়ে পাঁচ ঘন্টার উপর লেগেছে, কল্পনারও বাইরে। এর মাঝে গাড়ীতে ঘষা লেগেছে মোট পাঁচবার। শেষবার ঠিক জয়দেবপুর মোড়টা পেরুবার আগে আগেই। ঠিক করেছিলাম এযাত্রায় মেজাজগরম করবোনা। শেষ বারে তা আর ধরে রাখতে পারিনি।আমার জীবনে যতবার ঢাকা থেকে বাড়ী গিয়েছি তার মাঝে দীর্ঘতম সময় যাত্রার সাড়ে নয় ঘন্টা পর যখন বাড়ীর গেট পেরুলাম সূর্য ততক্ষণে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।ঢাকার তুলনায় ময়মনসিংহে ঠান্ডা বেশী,হঠাৎ করেই কনকনে বাতাস গায়ে লাগা শুরু হলো, আব্বা জ্যাকেট বের করে দিলেন উনার। প্রতিবারের মত আমরা আড্ডায় বসে গেলাম, বাড়ির বউরা রান্না বান্নায়, আগামীকাল ঈদ।

eid adda
এক।

ঢাকায় স্কুল ছুটি থাকলে মাতিস সাধারণত দেরী করেই বিছানা ছাড়ে, ঈদের দিন সকাল সাতটার আগে ওকে বিছানা ছাড়তে দেখে তাই অবাকই হলাম। আমাদের তিন ভাই দেশের বাইরে থাকায় ওরা ছাড়া বাকি পাঁচ জন পরিবার সহ বাড়িতে। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে সংখ্যাটা নিতান্ত কম নয়। সারা বছর খালি পড়ে থাকলেও ঈদের সময় বাড়ি গিজগিজ করে। এদিকে বাড়িতে গিজার লাগানো গোসলখানা একটাই, সাদ আর মাতিসকে গোসল দিয়ে যখন নাস্তা করাতে বসেছি ঘড়িতে আটটা বাজেনি সেসময়। নাস্তার পর ওদের নিয়ে গেলাম বাড়ীর পেছনে। সেখানে প্রথমেই পুকুর, শীত বলে পানি কম, বাঁশ ঝাড় আর সেগুন মেহগিনির বাগান। সে বাগানের পাশে ধানী জমি, তাতে পাকা ধান সোনালী হয়ে আছে। ধান ক্ষেত পেরুলেই বন। ওরা সবাই মেতে উঠলো খেলায়। একবার পুকুরের উঁচু পাড় বেয়ে উঠে আর একবার ধান ক্ষেতের ভেতর দৌড়ে বেড়ায়। সাদকে দেখলাম কিছু ধান ছিড়ে পকেটে ভরতে, ঢাকায় ফিরে মাকে দেখাবে।

Boys are taking breakfast on EID day
Walking through a paddy field
Kids are playing in wooded area
Group of boys on EID day
দুই।

ঠিক দশটায় ঈদ্‌গায়। শীতের দিন, কুয়াশা তখনও কাটেনি। এবারে জামাতে লোক সমাগম কম। কারনটা বুঝলামনা। আমাদের গ্রামে কোরবানীর নিয়মটা একটু অন্যরকম। সবাই যার যার কোরবানী নামাজের পর মাঠে নিয়ে আসে, সেখানেই কোরবানী দিয়ে ভাগের মাংস রেখে বাকিটা বাড়ি আনা হয়। এরপর সবার রেখে আসা মাংস একত্র করে গ্রামের সব পরিবারকে সমান ভাগ করে দেওয়া হয়। এছাড়াও বাড়িতে নিয়ে আসা মাংস থেকেও অনেকে গরীবদের দিয়ে থাকে। ব্যবস্থাটা একদিক থেকে ভালোই। এবারে গরু জবাইয়ের সময় আমি কাছাকাছি ছিলামনা, সময় কাটিয়েছি বাড়িতে, বাচ্চাদের সাথে।

Eid Embrace
Celebrating EID day
Eid Embrace
তিন।

দুপুরের আগে বাচ্চারা আবদার ধরলো ওরা শিকারে যাবে, কিভাবে যেন টের পেয়েছে বাড়িতে বন্দুক আছে। সেইমত বন্দুক হাতে দলবেঁধে পেছনের বাগানে। বন্দুকের ভার বইতে না পারলেও একেকজনের টার্গেট প্র্যাক্‌টিসের বিরাম নেই। সেনাবাহিনীতে থাকা আমার এক ছোট ভাই ওদের ইন্সট্রাক্টর, বাড়ির মেয়েরাও আবার বাদ যাবে কেন? ওরাও এসে জুটলো টার্গেট প্র্যাকটিসে। বাচ্চাদের সাথে মিশে আমরাও কিছুক্ষণের জন্য বয়সটা ভুলে গেলাম। ফিরে গেলাম শৈশবে। বাড়ির পেছন থেকে শুরু করে বন পর্যন্ত বেশ ক’বার দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত শরীরে বাড়িতে ফিরে খেতে বসলাম সবাই।

Kids are walking through a paddy field nearby Modhupur forest
Target Practise
Target Practise
চার।

দুপুরের পর একটু আলসেমী মত লাগলেও উঠে পড়লাম, পরদিনই ঢাকা ফিরবো, হাতে সময় কম, একবার বড়ই বাগানটা দেখে না এলে কেমন হয়। সখের বাগান। পাঁচ একরের বিশাল বাগানের গাছ গুলো দেখতে দেখতে বড় হয়ে গিয়েছে। এবারে ধরেছেও প্রচুর। পাতা আর ফল আলাদা করাই মুশকিল। মাস খানিক পর থেকেই খাবার উপযুক্ত হবে। গতবার ফলনের দাম পাওয়া যায়নি। খেয়াল করে দেখেছি যেকোন সব্জী বা ফল ঢাকায় যে দামে খুচরা বিক্রি হয় খামারে পাইকারী বিক্রি হয় তার তিন ভাগের একভাগ দামে, কোন কোন ক্ষেত্রে তারও কম। আমার পাশের বাগানের কাঁচামরিচ পাইকারী বিক্রি হতে দেখলাম প্রতি ৪০কেজি ৪৭৫টাকা দরে! বাগানে পৌঁছানো মাত্রই বাচ্চারা মেতে উঠলো খেলাতে।

Kids seating on a wooden watchtower inside a Lemon garden at Madhupur forest enjoying scenic beauty.
Kids are taking rest after a walk
Picking lemon from garden
পাঁচ।

সবশেষে আসুন আমাদের বাড়ির নুতন অতিথির সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, আশা করি আগামীবছর এই সময় তাকেও অন্যদের সাথে খেলায় মেতে উঠতে দেখা যাবে।


New to our family