Bangladesh লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Bangladesh লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১০

পাত্রখোলা আর সাতছড়ি

চারদিক নিশ্চুপ, অন্ধকার, বাগানের ভেতরকার সবচাইতে উঁচু পাহাড়ের উপর বিশালকায় বাংলোর আশেপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা বিরামহীন শীষ ছাড়া শোনা যায় রাত জাগা কাঠ ঠোকরার ঠক ঠক। হিম হিম ঠাণ্ডায় স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে শুয়ে নিদ্রাদেবীকে আকর্ষণের চেষ্টা সবেমাত্র সফল হতে যাচ্ছে তেমন সময় আদিবাসী গার্ডের ভাঙা গলা বেজে উঠে। নিশিপাওয়া মানুষের মতো বিছানা ছেড়ে উঠে আসি এক এক করে। হেঁটে হেঁটে বাংলোর পেছনে এসে আবিষ্কার করি চারজন আদিবাসী আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসে গান গাইছে
...তেরা সিথা নয়নে কাজল ক্যান ছোড়ি বুঝায়া বোল আধা দিনে হবি ডামাডোল
ওরে তোর নয়নে পানি ঝিলিমিলি, ছাড়িয়া নামি হাঁটু পানি
আমি বসি সিনান করি ক্যামনে শুকাই গতর খানি...

রাত আস্তে আস্তে বাড়ে, কিন্তু সময় থেমে থাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে বসে গান শুনি, স্থানীয় ভাষার গানের কলি আবার বাংলায় ভাষান্তরিত হয়। গানের রসের সাথে লবণ দেয়া সোনালী রংয়ের চায়ে হাফহাতা গেঞ্জী পেরিয়ে শীত কামড়ে ধরে না।

.........
পাত্রখোলা চা বাগান, নাম যেমন সুন্দর তেমন সুন্দর এর পরিবেশ আর মানুষ। ঠিক সন্ধায় যখন আরো অগুনতি বাগান পেরিয়ে পাত্রখোলায় গাড়ি ঢুকলো এর ব্যবস্থাপক সাকলাইন আমাদের চা খাইয়েই মাধবপুর লেক দেখাতে নিয়ে গেলেন আর আফসোস করতে লাগলেন আজ কেন আকাশে চাঁদ নেই। আমরা আফসোস করি না। অন্ধকার নেমে এলেও আকাশের শেষ লাল আভা লেকের পানিতে ভেসে থাকা গোলাপী পদ্মের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একসময় মিলিয়ে যায়, এ সৌন্দর্যের সাথে আফসোস থাকে না। আমরা ফিরে আসি। বাংলোর বিশাল বারান্দায় নিচু একটা টেবিলের চারপাশে গোল করে সাজানো চেয়ারে আলো না জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করে সারাদিনের ক্লান্তি সরিয়ে দেবার চেষ্টা করি। চোখে ভেসে থাকে বাতাসে দুলতে থাকা পদ্মের নাচন, পদ্মের রঙ হয় একবার সাদা একবার সোনালি, পদ্ম উঠে আসে আমাদের হাতে, সোনালি তরল হয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। চুপ হয়ে থাকি আমরা, ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যায় বাদুড়, একটা লক্ষ্মীপেঁচা ডেকে উঠে, অনুভবে অনুভবে সবার হৃদয়ের শূন্যতায় উজানগাঁ’র গলা হাহাকার নামিয়ে আনে, আমরা সবাই হয়ে যাই উকিল মুন্সি “...তুমি আমি জনমভরা ছিলাম মাখামাখি/আজ কেনো হইলে নিরল মেলো দুটি আখি রে পাখি... শোয়া চান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকী....।

আমরা কেউই কথা বলি না, এমনকি বেশি কথা বলার সোহেল ভাইও না। তারপরও উঠতে হয়, রাতের খাবারের আয়োজন নিজের বাংলোতে করেছে সাকলাইন। এক গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে রওনা দিই। পাহাড়ি রাস্তায় উঁচু থেকে গাড়ি ঝাঁপ দিলে বাস্তবে ফিরে আসি সবাই। কেউ কোমর আর কেউ কেউ মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঝাল ঝাল মুরগির মাংস দিয়ে পেট পুরে ভাত খাই। আমাদের ঘুম পায়।

.........
ভোরে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। পুরোনো বিশাল দরজা খুলে বাইরে বেরোলেই ভেজা বাতাসের ছোঁয়া পাই। বারান্দা থেকে দৌড়ে পালায় চারটা কাঠবেড়ালী। খাবারের খোঁজে পাখিগুলো কিচির মিচির করতে থাকে। আমি একা একা হাঁটি, পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে থাকি, বৃষ্টিহীন প্রকৃতিতে চা বাগান ধুসর বর্ণের, পূবদিকে দূরে একসারি ছায়া গাছ নিচে আসমানী রংয়ের কুয়াশা ধরে রাখে, সূর্যের আলো তেছরা ভাবে এসে সে রং ফালি ফালি করে কেটে দিয়ে যায়, আমি দেখতে থাকি। এক এক করে সবাই এসে যোগ দেয় আমার সাথে। মাতিস তার ক্যামেরা নিয়ে এখানে ওখানে ছুটে বেড়ায়, কোন সৌন্দর্য রেখে কোনটা ধরবে বুঝতে পারে না।


ধলুয়া কামালপুর সীমান্তের এই বাগানের ভারতীয় অংশে এতদিন শুয়ে ছিলেন আমাদের এক বীরশ্রেষ্ঠ। বাগানের কাছাকাছি সীমানা দেয়া বধ্যভূমি। নানা অজানা শহীদদের সন্মান জানাতেই হয়ত প্রকৃতি নিজের হাতে গড়ে তুলেছে এই বাগান। এরই মাঝে নাস্তার ডাক আসে। নাস্তা করেই আবার ছুটব।


.........
পাত্রখোলাকে বিদায় না জানিয়েই গাড়ি নিয়ে ছুটলাম ফুলবাড়ি, প্রাক্তন বিচারক প্রকৃতির প্রেমে সরকারি চাকুরী থেকে ইস্তফা নিয়ে এখন ফুলবাড়ি চা বাগানের দায়িত্বে। আমাদের আসার কথা শুনেই চা খেয়ে যাবার নেমন্তন্ন দিলেন। মাগুড়ছড়ায় বিস্ফোরণে যেখানে গর্ত তৈরি হয়েছিল ফুলবাড়ি বাগানের সে অংশে এখন পদ্ম ফুটে আছে। ভদ্রলোকের ফুলের সখ। চমৎকার সাজিয়েছেন ফুলের বাগান, তাতে প্রজাপতি আর মৌমাছিরা ঘুরে বেড়ায়। আমিও ঘুরতে থাকলাম ক্যামেরা নিয়ে। নানান রঙের আর বর্ণের ফুল, সব নাম জানি না। একদিন পূর্ণিমা রাতে উনার বাংলোতে থাকার কথা বললেন, বাউলের আসর বসাবেন। আমরা মানা করি না। হেঁটে হেঁটে গেলাম বাংলোর কাছে।


এখান থেকে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে গাড়ি ছোটালাম। লাউয়াছড়ার মুল অংশে ভেতরে খাসিয়া রাজার বাড়ি, পিকনিক করতে আসা হাজার মানুষের ভীড় আর লাউডস্পিকারের শব্দ সহ্য করে বনে ঢোকা আর তার চাইতে লোভনীয় খাসিয়া রাজার বাড়িতে চা খাবার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে লাউয়াছড়া পেরিয়ে শ্রীমঙ্গল ছাড়িয়ে সাতছড়ির দিকে যেতে থাকলাম।


আজকের রাত কাটাব সাতছড়িতে। স্থানীয় মন্ত্রীর অনির্ধারিত যাত্রা বিরতির কারণে সাতছড়ির বনবিভাগের বাংলোতে বেশ ভীড়। অবশ্য আমরা চলে আসাতে মিনিট পাঁচেকের ভেতর উনি চলে গেলেন।


বিকেলে ঢুকে গেলাম বনের ভেতর। ছবির মতন সুন্দর বন, নাম না জানা গাছ, তাতে পাখির বাসা। সূর্য ডোবার আগে আগেই ঘরে ফিরতে থাকল। কিচির মিচির করে খোঁজ নিলো আর কেউ বাকি রয়ে গেলো কি না। একটা বনমোরগ একটানা অনেকক্ষণ ডেকে গেলো। আমরা হাঁটলাম, হাঁটতে হাঁটতে ত্রিপুরা পল্লীতে চলে এলাম। হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলো ওরা। পাশের বাড়ির ছোট্ট বালক পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে গেলো আমাদের। দুই বাড়ি পর ঘরের দাওয়ায় পড়তে বসে গেছে স্কুল বালিকা, সাথে সাথেই মনে পড়ল এ এলাকায় বিদ্যূৎ নেই।


অনেক রাত পর্যন্ত অন্ধকারে বাংলোর সামনে খোলা জায়গায় বসে আড্ডা দিলাম। বাংলোর বাবুর্চি “সাথীর মা” একটু পর পর চা’য়ের যোগান দিতে থাকল। একসময় ঠাণ্ডায় যখন কাঁপতে থাকলাম তখন উঠে ঘুমাতে গেলাম।


পরদিন আবারো খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ক্ষুধার্ত বানরের দল খাবারের দখল নিতে ঝগড়া বাঁধিয়েছে। আস্তে আস্তে বাংলো থেকে নেমে সামনের রাস্তা পেরিয়ে বনের ভেতর ঢুকলাম। ছোট্ট পায়ে চলা পথ, এলোমেলো, উঁচু নিচু, দুপাশ থেকে জংলী গাছ এসে ছুঁয়ে দিয়ে যায়, ধরে রাখতে চায়, আমরা হাত দিয়ে সরিয়ে সামনের দিকে হাঁটি, মাথার উপর বড়ো গাছের ছাউনি, তার থেকে টিপ টিপ করে বৃষ্টির মতন শিশির ঝরে পড়ে। আমরা সারি বেঁধে সে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটি, সে পথ একসময় শুকনো পাহাড়ি নালা পেরোয়, আমরা নালাতে নেমে যাই। নিচে সাদা বালি, শুকনো, বৃষ্টি এলেই স্রোতের কারণে এপথে হেঁটে যাওয়া যাবে না। মাকড়সার জাল হাত দিয়ে সরিয়ে আমরা বালিতে হাঁটতে থাকি, দুপাশে খাড়া দেয়াল, কিনারে বাঁশ গাছ, পেছনে বন। এরই ফাঁক গলে সূর্য উঁকি দেয়া শুরু করেছে। আমরাও বুঝতে পারলাম ফেরার সময় হয়েছে।


Inside Satchori reserve forest

Matisse at Patrokhola tea garden

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ০৫, ২০০৯

'এলাট' সুন্দরবন

পর্যটক হিসাবে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের দেখা পেয়েছেন তেমন লোক হাতে গোনা যাবে। আর খপ্পরে পড়েছেন? নাহ্, আমি অন্তত তেমন কিছু শুনিনি কোনদিন। তবে, যতবার গিয়েছি আশেপাশের কেউ তার শিকার হয়েছেন সেকথা শুনেছি প্রতিবার। কখনও লাশ ফিরিয়ে আনা গেছে, কখনও পাওয়া যায়নি। এই যেমন, এবারে তিন জনকে বাঘে ধরার খবর শুনেছি, তিনটাই ছিলো টাটকা। দুজনের লাশ ফিরিয়ে আনা গেছে আর একজনকে আহত অবস্থায়। একটা করে খবর আসে আর আমাদের বাপ্পিদা ফোনে সংবাদ পাঠান, পরদিনের দৈনিকে টাটকা খবর হিসাবে। শেষেরটা ছিলো ভয়াবহ। গামছায় ভরে ছিন্নভিন্ন দেহ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সেই ট্রলার এসেছে মাঝনদীতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে আটকে থাকা আমাদের উদ্ধার করতে, ট্রলারের মাঝির লাশদেখে বমি করে দেবার দাগটুকু মোছার আগেই।এবারের ঘোরাঘুরিটা এরকম অনেক কারনেই মনে দাগ কেটে থাকবে আজীবন। গিয়েছিলাম দুবলার চরের রাসমেলা দেখতে। কত শুনেছি এই রাসমেলার কথা। অথচ সেখানে পৌঁছে পূজার আগেই ফিরে এসেছি আশাহত হয়ে। আসলে সুন্দরবন দেখতে হলে সুন্দরবনে থাকাই ভালো।প্রচলিত ধারার ট্যূর কোম্পানীর সাথে বেড়াতে যেয়ে সুন্দরবনের মজা কতটুকু পাওয়া যায়, তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে আমার। মানে আরাম পাইনি কোনদিন। অনেক নিয়মের বেড়াজালে নৌকা ভ্রমনটাইপের একটা ব্যাপার ঘটে সেখানে। তাই গুগুল ম্যাপের কল্যানে প্রতিবারই নুতন জায়গা খুঁজে বের করে সেদিকে ঘুরে আসার ভেতর যে রোমাঞ্চ, তার প্রতি আগ্রহটাই বেশি আমার।
ভয়, উৎকন্ঠা, সাহস আর রোমাঞ্চপ্রিয়তার এক চুড়ান্ত ঘটনার কথা আজ শুনাবো আপনাদের। সুন্দরবনের হিরনপয়েন্ট পুরো বনএলাকার বনেদী অঞ্চলগুলোর অন্যতম। ভারতীয় সীমান্ত থেকে ২৫ মাইল পূবে সুন্দরবনের দক্ষিণে হিরনপয়েন্টে ফরেস্ট অফিস ছাড়াও মংলা পোর্টের শাখা অফিস আর নৌবাহিনীর ডেরা আছে সেখানে। ফরেস্ট অফিসের উত্তরে নদীর ঠিক ওপারে বনটার নাম কেওড়াশুটি, সম্ভবত প্রচুর কেওড়া গাছ আছে বলেই। চারদিকে নদীঘেরা পূবে পশ্চিমে দুমাইল আর উত্তর দক্ষিণে আধামাইলের কিছু বেশী জায়গাটা গুগুলে খুঁটিয়ে দেখতে যেয়ে কিছু বিশেষত্ব খুঁজে পেলাম। যেমন ধরেন, এর মাঝখানে একটা অংশে গাছপালার পরিমান কিছুটা কম, ভেতরে একটা মিঠা পানির পুকুরের মতন আছে এসব। যার সবগুলোই আসলে প্রমান করে ভেতরে প্রচুর হরিনের অবস্থান আর অবধারিত ভাবেই বাঘের উপস্থিতি। ট্যুর কোম্পানীগুলো এসব স্থান এড়িয়ে চলে, এমনকি আমাদের বাপ্পিদাও প্রথম প্রথম নিমরাজি ছিলেন। আমাদের, বিশেষ করে আমার অটল সিদ্বান্তের কারনেই শেষপর্যন্ত এবারের সুন্দরবনযাত্রার প্রথম ভোরে নাস্তা সারবার আগেই ঘন্টা দুয়েকের জন্য ভেতরে এ জায়গায় যাবার অনুমতি দিলেন। আমার বেশ ক’বার বনযাত্রায় যত জায়গা দেখেছি আর যত ছবি তুলেছি তার ভেতরে সবচাইতে সুন্দর যায়গা আর ছবিগুলো এখানকারই।
সেখান থেকে ফিরে এসে সিদ্বান্ত নিলাম দুবলারচরে অবস্থানের সময় কমিয়ে এনে পরদিন বিকেলে আবারো এ জায়গাটাতে আরেকটু বেশী সময় কাটিয়ে যাবো। দুবলারচর থেকে তাই মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই দুপুরের দিকে হিরনপয়েন্টের দিকে ফিরতি যাত্রা করলাম। ততক্ষণে ভাটা নেমে এসেছে। হিরনপয়েন্টের প্রায় দুকিলোমিটার দূরে থাকতেই পানির অস্বাভাবিক কমে যাওয়া খেয়াল করছিলাম, আরেকটু কাছে আসতেই আমাদের ট্রলার বালুতে আটকে গেল। নীচের ঢেউ দেখে বোঝার উপায় নেই যে পানি এখানে মাত্র দু / আড়াইফিট। হিসাব করে দেখলাম পরবর্তী জোয়ার আসতে আসতে আরো প্রায় তিন ঘন্টা লাগবে, তাই নেমে গেলাম পানিতে। হিরনপয়েন্টের ওপারের জায়গাটায় হেঁটে যেতে হলে গলা পানি ভাংতে হবে। তাতে সময় বেশী লাগবে আর ক্যামেরাও ভিজে যেতে পারে সেই চিন্তায় নুতন প্ল্যান করলাম। আমরা যেখানে নেমেছি সেখান থেকে সোজা হেঁটে ভেজা বালুর চর পেরিয়ে অল্প একটু কেওড়া আর গর্জনের বন পেরুলেই পৌঁছে যাবো ঐ তিন অফিসের পেছনের ঘন ছন গাছে ছাওয়া বিশাল মাঠের কিনারে। সেখান থেকে মাঠের মাঝদিয়ে ছোট্ট একটা মিঠাপানির জলার পাশদিয়ে পরিত্যাক্ত হেলিপেড পাড়ি দিলেই ছোট্ট মাটির রাস্তা বেয়ে ফরেস্ট অফিসের পুকুর। ঘুরতে ঘুরতে ছবি তুলতে তুলতে সেখানে পৌঁছাতে আড়াইঘন্টার বেশী লাগবার কথা নয়। আমরা পাঁচ সহযাত্রী বনের কাছাকাছি আসতেই রাইফেল হাতে এমদাদ আর রেজাউল নেমে এলেন। পানিতে নেমেছিলাম বলে সবার পা খালি। বনের কাছাকাছি বালুতে ছোট ছোট ঘাস, পায়ে কাটার মত বিঁধে। এরমাঝে শ্বাসমূল, এগুলোর খোঁচাও পায়ে লাগে। অনেকদূর যেতে হবে এই কষ্ট গায়ে মেখে। আমাদের দুজন তাই নৌকায় ফিরে গেলো। আমরা হাঁটছি সাবধানে। খুবকাছে দিয়ে হরিণ ছুটে যায়, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, ছবি তুলি একটা দুটো। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বনের প্রান্তে। এমদাদ আরেকপ্রস্থ বনের নিয়ম স্মরণ করিয়ে দিলো সবাইকে। সমূহ বিপদের কথা মাথায় রেখে রেজাউল তার রাইফেল তৈরী রাখলো। কেওড়া বনে হালকা পানি, কাদাও আছে। আমার সামনে এমদাদ, পেছনে অন্যরা, সবশেষে রেজাউল। এমদাদ যেখানে পা ফেলে আমিও সেখানে, তাতে কাঁটা ফোটার সম্ভাবনা কম। একশ মিটার পেরোতে আধঘন্টা পেরিয়ে গেলো, সামনে হাতদশেক জুড়ে কাঁটা গাছ আর ঘাস, হাতখানিক লম্বা, অবশেষে ছনে ঢাকা মাঠ। ডানদিকে পোর্ট অফিসের দোতলার ছাঁদ দেখা যায়। উপরদিকে তাকালে টাওয়ার। দুদিন আগেও ছন বাগানের ওদিকটাতে এসেছিলাম একবার, সেদিকে ছেঁটে ফেলায় ছন গাছ দেখাচ্ছিলো ঘাসের মতন। কিন্তু এদিকে ছনের আগা মাথা ছুঁয়ে যায়। কয়েকপা এগিয়ে ডাকলাম ‘এমদাদ’। আমার দিকে ঘুরে মনের কথা পড়ে ফেললো সে। বললো, ‘ঠিকই বস্, এখান দিয়ে যাওয়া নিরাপদ না’। হিরনপয়েন্ট এলেও এমদাদ এদিকে আসেনি। আমার গুগুল জ্ঞান আর এমদাদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ঠিক করলাম ছনের বন আর কাঁটা গাছের পাশদিয়ে পশ্চিমে হেঁটে মিঠা পানির জায়গাটার পাশদিয়ে পরিত্যাক্ত হেলিপ্যাড দিয়ে উত্তরে উঠবো আমরা। সে অনূযায়ী ঘুরে বেড়িয়ে এলাম, রেজাউল সহ আমাদের একজন তখনও কাঁটা গাছ পেরোচ্ছে পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে। আমার আরেক সহযাত্রী বললো ‘সামনে হরিণ পাওয়া যেতে পারে, টেলি লেন্সটা লাগিয়ে নিই’। সামনে হাতপাঁচেক দূরে কয়েকহাত খোলা জায়গার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম ‘সেখানে যেয়ে করেন’। সেখানে পৌঁছে যেইনা সে নিচু হয়েছে অমনি রক্ত হিম করা ভয়ঙ্কর সে ডাক। আমাদের বামে দশহাতের ভেতর একদেড় হাত উঁচু কাঁটা আর ঘাসের ভেতর থেকে।
মূহুর্তের ভেতর অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেলো একসাথে। এমদাদ ‘এলাট’ বলে (এলার্ট নয়) চিৎকার দিয়ে রাইফেল কক্‌ করে হাটু ভেঙ্গে বামে তাক করে বসলো। আমার বামহাতে ক্যামেরা বামদিকেই তাক করা ছিলো, তাতে ডান হাতের চাপে ছবি উঠলো, আমার পাশের জন একহাতে ক্যামেরা আর অন্য হাতে লেন্স নিয়ে চট করে বসে গেলো। পেছনের দুজন কাছাকাছি ঘেসে দাঁড়ালো আর রেজাউলের রাইফেল নিরবে ঘুরে গেলো শব্দের উৎসের দিকে। কি যেনো দেখলাম মনে হয় নড়ে উঠলো, এরপর চারদিক নিঃশব্দ, কোন আওয়াজ নেই কোথাও। বাতাসও মনে হলো থেমে আছে, শুধু শব্দের উৎসের কাছে ছোট একটা কাঁটা গাছ আস্তে আস্তে দুলতে দুলতে থেমে গেলো। নিরবতা ভেঙ্গে এমদাদ বলে উঠলো চলে গেছে, তাড়াতাড়ি হাঁটেন। ক্যামেরার স্ক্রীনে তাকালাম, দশহাত দূরে গোলপাতা আর সামনে কিছু কাঁটা গাছ আর ঘাসের ছবি। সামনের মাটিতে টাটকা পায়ের ছাপ অভিজ্ঞ এমদাদের চোখ বলে পূর্নবয়স্ক পুরুষ বাঘ এটি, উচ্চতা সাড়েতিন ফুটের কাছাকাছি। অথচ এত ছোট ঘাসের মাঝে নিজেকে এমন ভাবে লুকিয়ে রেখেছিলো আমাদের কারো চোখে পড়েনি।
আর কোন সমস্যা ছাড়াই চলে এলাম ফরেস্ট অফিসে, ছন বনের জলায় মাছ ধরতে থাকা পোর্টের দুজনও চলে এলো আমাদের পিছুপিছু।

...............
স্থানীয় সবাই অভিজ্ঞতার পুরো বিবরণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনার পর ঘটনার আকার দাঁড়িয়েছে এরকম...
বালুর মাঠ থেকে বনে আমাদের ঢুকতে দেখে বাঘ আক্রমনের সিদ্বান্ত নেয়। কাউকে বা কিছু আক্রমন করতে গেলে বাঘ অনেক্ষণ ধরে সেটা অনুসরণ করে আচার আচরন খেয়াল করে এরপর আক্রমনের স্থান নির্ধারন করে ওৎ পেতে থাকে। আমরা যখন বনে আস্তে আস্তে হাঁটছি সেসময় সে আমাদের আচরন খেয়াল করে টার্গেট ঠিক করে সেখানে ওৎ পেতে ছিলো। কোন কারনে টার্গেটের অস্বাভাবিক কোন আচরনে বাঘ, বিশেষত রয়েল বেঙ্গল টাইগার তার আক্রমনের সিদ্বান্ত পরিবর্তন করে।
আমাদের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে তিনটি বিষয়, প্রথমত বনে আমরা আস্তে হেঁটেছি কিন্তু বন পেরিয়ে একটু জোরে, দ্বিতীয়ত একবার ঘন উঁচু ছনবনে ঢুকেও আমাদের বেরিয়ে আসা, তৃতীয় কারনটা আমার সাথে থাকা ক্যামেরার লেন্স বদলাতে যাওয়া সহযাত্রী, বেশীরভাগের ধারনা বাঘের টার্গেট ছিলো সে এবং বাঘ লাফ দেবার চুড়ান্ত মুহুর্তে সে লেন্স বদলাতে যেয়ে বসে যাওয়াতেই বাঘ হালকা গর্জন করে বিরক্তি প্রকাশ করে সরে গেয়েছে। তাদের মতামত বাঘ যদি আক্রমনের মুডে না থাকতো তাহলে এত বড় বাঘ অবশ্যই আমাদের নজরে আসতো।

ছবিঃ কেওড়াশুটি বন
Inside Sundarban

Kewrashuti, Sundarban

Kewrashuti, Sundarban

Kewrashuti, Sundarban

ছবিঃ দুবলার চর
A lonly boy

Dry Fish preparation at Dubla

people coming to Dubla 'Ras Mela' for  worship

20091101_7765

20091101_7772

ছবিঃ হিরনপয়েন্টে নৌকা আটকে থাকা
20091101_7823

ছবিঃ হিরনপয়েন্ট যেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকেছি
Hironpoint, Sundarban

ছবিঃ চিত্রল হরিণ
Spotted Deer (Axis axis)